বাংলাদেশ ও বর্তমান নারীসমাজের চিত্র

সিকদার মোহাম্মদ জাকারিয়া

সৃষ্টির পরতে পরতে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। তাই তো জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের  ভাষায় :‘বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনের প্রতিটি পর্বেই রয়েছে নারীদের অনবদ্য অবদান। নারীরা পরম মমতায় আগলে রাখে তার পরিবারকে, তেমনিভাবে তাদের সুনিপুণ দক্ষতা ও প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছে জাতীয় অর্থনীতি, শিল্প-সাহিত্য, বিজ্ঞান-প্রযুক্তিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে। দেশের নানান শৃঙ্খল থেকে মুক্তির সময় নারী পুরুষের মতোই অবদান রেখে যাচ্ছে। দিন শেষে পুরুষের প্রতিটি ক্ষেত্রেই মুক্তি পেলেও নারীর মুক্তি কতটুকু সম্ভব হয়েছে? 

জার্মান সমাজতন্ত্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ক্লারা জেটকিনের (জুলাই ৫, ১৮৫৭, জুন ২০, ১৯৩৩) নেতৃত্বে ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্কের সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়। ১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ক্লারা প্রতি বছর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯১১ সাল থেকে নারীদের জন্য দিনটি উদ্যাপন করা হচ্ছে যা ১৯৭৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয়ে আসছে।  বিশ্বের কিছু দেশ এই দিনটিকে ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেছে  এবং কিছু দেশ এই দিনটিতে শুধু নারীরাই সরকারি ছুটি ভোগ করে (চীন)। নারীর অবদানকে শ্রদ্ধা জানাতে প্রতিবছর ৮ মার্চ বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস।  নারী দিবস নারীদের জন্যে একটি মাইলফলক। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে নারীদের অবস্থান বিবেচনা করলে দেখব যতটুকু উন্নতি সাধন হয়েছে তা খুবই নগণ্য। আজকের বাংলাদেশে প্রতিটি জায়গায় নারীদের অবহেলার দৃশ্য লক্ষণীয়। বিশেষ করে নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ততটা লক্ষ্য করা যায় না। যার ফলে নারীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানবিক অধিকারগুলো সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।

‘নারী, ব্যবসা ও আইন ২০১৯ শীর্ষক’ বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনটিতে বিশ্বের ১৮৭টি দেশের ওপর পর্যবেক্ষণ চালিয়ে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে স্কোর-৪৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ যেখানে শতভাগ স্কোর পেয়েছে বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, লাটভিয়া, লুক্সেমবার্গ ও সুইডেন।

নারীর অবস্থা যখন এমন হতাশাব্যঞ্জক, তখন আশার বাণী হচ্ছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ নানা ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু সেখানেও বৈষম্য। নারীকে আজ পণ্য হিসেবে ব্যবহারের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে। বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের দিকে তাকালে দেখতে পাই কিভাবে নারীকে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তাছাড়া বেতনে বৈষম্য, কাজে বৈষম্য, প্রমোশনে বৈষম্য ইত্যাদি। স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা এই বৈষম্য থেকে নারীদের মুক্তি দিতে পারছি না। তবে আগের তুলনায় অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে।

ক্রীড়াক্ষেত্রে গত কয়েক বছরে দেশের নারী খেলোয়াড়রা অনেক সাফল্য অর্জন করে। তারা একের পর এক আন্তর্জাতিক ম্যাচ জিতে দেশের সুনাম বৃদ্ধি করেছে। তাছাড়া রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। সমপ্রতি নরসিংদী জেলা প্রশাসক, জেলা ও দায়রা জজ, পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক, মুখ্য বিচারিক হাকিমসহ  জেলার এসব গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ পদে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নারী কর্মকর্তারা। যা নারীর ক্ষমতায়নের ফসল। তবে এমন ঘটনা খুবই বিরল হলেও আশাব্যঞ্জক। দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী। তাদেরকে বাদ দিয়ে দেশের সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয়। নারীদের অধিকার নিশ্চিত করাসহ  উন্নয়নবিরোধী সব প্রতিবন্ধকতাকে দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করতে পারলে আমরা অবশ্যই ২০৩০ সালের মধ্যে সাফল্যের সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারব। নারীদের ওপর বৈষম্য হ্রাস ও নারীদের সকল অধিকার নিশ্চিত করে একটি উন্নত ও আদর্শ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই  হোক নারী দিবসের অঙ্গীকার।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়