ফারহানা নওশিন তিতলী
বর্তমান বিশ্বে জনসংখ্যার দিক থেকে নারী পুরুষের অনুপাত প্রায় সমান। ২০১১ সালের আদমশুমারির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের নারীর সংখ্যা ৭ কোটি ১০ লাখ ৬৪ হাজার। পুরুষ ও নারীর সংখ্যার অনুপাত ১০০:১০৩। সমাজ সংসার বা পরিবার যেমন একজন পুরুষ ছাড়া চলে না ঠিক তেমনি নারীর অবদানও এই জগত্ সংসারে কোনো অংশে কম নয়। একটি শিশু যেমন মা ছাড়া অচল ঠিক তেমনি একটি পরিবার নারী ছাড়া অচল। বর্তমান বিশ্বে নারীরা কোনো অংশে পুরুষের চেয়ে পিছিয়ে নেই। নিজেদের দক্ষতা, যোগ্যতা, বিচক্ষণতা ও পরিশ্রম আজ নারীদের পৌঁছে দিয়েছে উন্নতির সর্বস্তরে।
পরিশ্রম নারীদের যেমন সফলতার চাবিকাঠি ঠিক তেমনি তাদের সফলতার সঙ্গে পুরুষরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একজন নারীকে সফল হতে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু বা পরিচিত কোনো না কোনো পুরুষ যে কোনোভাবে সাহায্য করেই চলেছে। পুরুষরা যদি নারীদের সাহায্য না করত তাহলে হয়তো কোনো নারী সংসারের সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থানে সময় দিতে পারত না।
নারীত্ব মানে আচরণ, ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক ভূমিকা। এই নারীত্বের মূল্যবোধ ছেলে শিশুদেরও শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। শুধু মেয়েকে নয় ছেলেকেও সহনশীলতা, যত্নশীলতা, সহযোগিতা ও শান্তির শিক্ষা পরিবার ও স্কুলে দেওয়া প্রয়োজন।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের রাস্তাঘাট বা যে কোনো জায়গা নারীদের জন্য নিরাপদ না। বাংলাদেশ একজন পুরুষের জন্য যেমন অভয়ারণ্য কিন্তু সর্বস্তরে একজন নারীর নিরাপত্তা প্রদানে বাংলাদেশ এখনো সক্ষম হয়নি। এজন্য হয়তো প্রতিদিনের খবরে নারী ধর্ষণ বা নারী অপহরণের মতো খবর নিয়মিত আসছে। কিছু বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ শিশুদেরকেও শোষণ, নিপীড়ন করতে কুণ্ঠাবোধ করছে না। এরূপ কিছু সংখ্যক পুরুষের জন্য বদনাম হচ্ছে সমস্ত পুরুষ জাতির। শিশু ও নারীদের প্রতি কিছু নির্মম ও নৃশংসতার জন্য আমরা নারীরা সমস্ত পুরুষ জাতিকে দোষারোপ করি। কিন্তু আমাদের প্রত্যেকের ভাবা উচিত নারী পুরুষ নির্বিশেষে আমরা সবাই মানুষ। আর প্রত্যেক জন মানুষ যে আমরা ভালো তা কিন্তু সৃষ্টিকর্তা কোথাও বলেননি। ভালো খারাপ মিলেই আমরা মানুষ। পৃথিবীতে এমনও মানুষ আছে যে ধর্ষণ করে আবার এমনও মানুষ আছে যারা ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। রাস্তাঘাটে কোনো মেয়েকে নির্যাতিত হতে দেখলে সেই মেয়ের পাশে দাঁড়ায়। এমনও স্বামী আছে যারা প্রতিনিয়ত স্ত্রীকে নির্যাতন করে আবার এমনও স্বামী আছে যারা সারাদিনের ক্লান্তি শেষে অবসরে পরিবারের গভীর ভালোবাসায় মগ্ন থাকে। আমরা নারীরা যে কোনো বিষয়ে বলে থাকি যে নারী পুরুষের সমান অধিকার আবার সুযোগ বুঝে যে কোনো কাজে এটাও বলি যে ‘লেডিস ফার্স্ট’। সমান অধিকার যদি নিতেই হয় তাহলে বিনিময়টাও সমান হওয়া উচিত। আমরা নারীরা সংসারের কাজে দারুণ পারদর্শী কিন্তু কর্মক্ষেত্রে কি একটি পুরুষের সমান সময় দিতে পারছি?
বর্তমানে নারীদের উল্লেখযোগ্য যে সমস্যাগুলো রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো নারীদের প্রতি বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি। সমাজের কিছু অশিক্ষিত মানুষের দ্বারা নারীরা প্রতিনিয়ত মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে। সমাজের কিছু মানুষের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের জন্য নারীরা পিছিয়ে যাচ্ছে সফলতার হাজার হাজার মাইল দূরে। অন্যকে দোষারোপ করে এই সমস্যাটি সমাধান হওয়ার নয়। যেখানে একজন কর্মজীবী নারীকে সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরতে দেখে আরেকজন নারী বাজে মন্তব্য করেন সেখানে আপনি কীভাবে সমাজের কুরুচিপূর্ণ পুরুষের মুখ আটকাবেন? তাই নিজেদের স্বার্থে নারীদেরকেই তাদের নিজের ভালো খারাপ দিকগুলোর দিকে খেয়াল করে চলতে হবে। বিচার চেয়ে যেখানে বিচার পাওয়া যায় না সেখানে নিজেকে সামলে চলাটাই শ্রেয়। তাই নারীদের বাঁচা উচিত পুরুষের সমালোচনায় নয়, নারীদের বাঁচা উচিত নিজের সমালোচনা নিজেই করার মাধ্যমে।
n লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।