ফুল চাষ ও ফুলশিল্পের বিকাশ

কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ‘ফুলের ফসল’ কবিতায় লিখিয়াছেন, ‘জোটে যদি মোটে একটি পয়সা/ খাদ্য কিনিয়ো ক্ষুধার লাগি’/ দুটি যদি জোটে অর্ধেকে তার/ ফুল কিনে নিয়ো, হে অনুরাগী!’। আসলে আমাদের ভালো থাকা, ভালো লাগা ও মনের ক্ষুধা মিটাইবার ক্ষেত্রে ফুলের গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা ফুল দেখিলে বা কেহ ফুল উপহার দিলে আনন্দিত হই, আত্মপ্রশান্তি লাভ করি। এই কারণে দেখা যায় পৃথিবীর এমন কেহ নাই, যিনি ফুল অপছন্দ করেন। আশার কথা হইল, বাংলাদেশে ফুলের কদর ও সমঝদার লোকের সংখ্যা দিন দিন বাড়িতেছে। ইহার ফলে বাড়িতেছে ফুলের উত্পাদনও। এমনকি নিজস্ব চাহিদা পূরণ করিয়া ফুল রপ্তানিও হইতেছে। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ২০১৫-১৬ অর্থবত্সরে পানপাতাসহ ফুল রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ডলার। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে ফুল রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হইয়াছে। এই জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় দেশে প্রথমবারের মতো ফুল গবেষণাকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়াছে। ফুল চাষকে আরো গতিশীল করিতে এই ধরনের উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই।

আলোচ্য ফুল গবেষণাকেন্দ্রটি নির্মিত হইতে যাইতেছে যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলায়। এই উপজেলাটি বিভিন্ন প্রকার ফুল চাষের জন্য বিখ্যাত। ধারণা করা হইতেছে, ইহার মাধ্যমে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে ফুল ও শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদের উত্পাদন ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পাইবে এবং ফুলজাতীয় পণ্য সংগ্রহের পর ১৫ শতাংশ ক্ষতি কমাইয়া আনা যাইবে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ইতোমধ্যে ১০টি ফুলের ১৯টি জাত উদ্ভাবন করিয়াছে এবং ফুল ও শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদের চাষপদ্ধতি, ফুল সংগ্রহের প্রযুক্তি, প্যাকেজিং ইত্যাদি সম্পর্কিত ২০টি কলাকৌশল উদ্ভাবন করিয়াছে। আশা করা হইতেছে, ফুল গবেষণাকেন্দ্রটি স্থাপিত হইলে এই ধরনের গবেষণা কার্যক্রম আরো বেগবান হইবে। ঝিকরগাছার ২০ হেক্টর জমির উপর নির্মিতব্য এই গবেষণাকেন্দ্রে থাকিবে টিস্যু কালচার ল্যাব, পোস্টহার্ভেস্ট ল্যাব, বিভন্ন ফুল ও শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদের ৫০০টি জার্মপ্লাজম সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ইত্যাদি। পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্পটির অনুমোদন প্রক্রিয়া চলমান। আমাদের প্রত্যাশা, যুগোপযোগী এই সিদ্ধান্তটি যেন দ্রুত বাস্তবায়িত হয়।

বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটি ফুল চাষের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। বর্তমানে দেশে প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হইতেছে। ইহার সহিত জড়িত রহিয়াছেন ৫০ হাজার কৃষক এবং প্রায় ১০ লক্ষ লোকের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ফুল চাষের উপর নির্ভরশীল। ইহার বাণিজ্যিক ও রপ্তানিমুখী চাষাবাদ বাড়াইতে পারিলে তাহা আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিবে নিঃসন্দেহে। একসময় ইহা একটি লাভজনক ও টিকসই শিল্প হিসাবেও বিবেচিত হইতে পারে। তবে ফুল চাষে চাষিরা বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন। যেমন—ফুলের উন্নত জাত ও ভালো বীজ-চারার অভাব, আধুনিক প্রযুক্তি ও মানসম্মত উপকরণের ঘাটতি, কার্যকর সংগ্রহ ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির অভাব, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি প্রভৃতি। এই সকল বাধা দূর করিয়া ফুলশিল্পকে সমৃদ্ধ করা একান্ত দরকার। কেননা ভালোভাবে বাঁচিয়া থাকিতে হইলে ফুলের ঘ্রাণ ও ফুলের সৌন্দর্য আমাদের উপভোগ করিতে হইবে। আবারও কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায় বলিতে হয়, ‘বাজারে বিকায় ফল তণ্ডুল/ সে শুধু মিটায় দেহের ক্ষুধা,/ হূদয়-প্রাণের ক্ষুধা নাশে ফুল/ দুনিয়ার মাঝে সেই সেই তো সুধা!’