নারীর অগ্রগতির মূল প্রতিবন্ধক সংকীমানসিকতা

শামীমা খাতুন

আমাদের দেশে বর্তমান সময়ে মনে করা হয় যে নারীসমাজের অগ্রগতি হয়েছে বা হচ্ছে। কিন্তু আসলেই কি নারীর অগ্রগতি হচ্ছে, নাকি তা শুধু সমাজের দৃষ্টিতেই সীমাবদ্ধ? প্রশ্ন থেকে যায় এখনো হয়তো হাজারো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন নারীসমাজের মনে। স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, রাস্তাঘাট—সবখানেই কি নারীরা মুক্তভাবে চলতে পারছে? না এখনো তারা পারছে না নিশ্চিন্তে পথ চলতে। শিক্ষক দ্বারা ছাত্রী, একজন বন্ধু দ্বারা তার বান্ধবী, এমনকি রাস্তাঘাটে অহরহ শোনা যায় মেয়েরা ধর্ষিত হচ্ছে। আর এই ধর্ষণ শুধু নারীর শরীরেই নয়, মনের ওপরও করা হয়। ফেসবুক-মেসেঞ্জারে অশ্লীল ছবি, ভিডিও এমনকি অশ্লীল কথাবার্তা বলেও একজন নারীকে মানসিকভাবে ধর্ষণ করা হয়, যেটা হয়তো চোখে দেখা যায় না বা জানাও যায় না। কিন্তু এই মানসিকভাবে ধর্ষণের ফলে নারীর স্বাভাবিক জীবন যাপনে বিঘ্ন ঘটছে, যার খবর হয়তো কোনো পত্রিকা ছাপবে না, কোনো সমাজও মানবে না। শুধু বলবে, আমাদের দেশে নারীর অগ্রগতি হচ্ছে। আসলে আমাদের দেশে এখন মানুষের চেয়ে পুরুষ বেশি আর পুরুষের চেয়ে পুরুষেরা পুরুষত্ব দেখায় বেশি, যার ফলে ধর্ষণ হয় এত বেশি। কিন্তু আমাদের দেশে ধর্ষণকারীরা যথোপযুক্ত শাস্তি পায় না। কোনো ধর্ষণকারীর এখন অবধি যখন মৃত্যুদণ্ডই হলো না, তখন সেদেশে নারীসমাজের অগ্রগতিকে আসলে অগ্রগতি বলাটা বড্ড বেমানান লাগে। নারীরা শুধু নিজেকে নারীই মনে করেন, নারী বলে তারা কাঁটা বিছানো পথে হাঁটতে ভয় করে তাদের শরীর নষ্ট হবে ভেবে। আসলে কোনো নারীই নারীর স্বভাব নিয়ে জন্মায় না, তারা নিজেকে শরীরকেন্দ্রিক নারী ভাবতে ভাবতে বড়ো হয়। অবশ্য এর জন্য একটা পরিবার দায়ী। পরিবারগুলো সাধারণত কন্যাসন্তানকে ছোটোবেলা থেকেই ভাবতে শেখায় যে সে তার শরীরের জন্য নারী আর তার জন্ম একজন পুরুষের ভোগ্যপণ্য হওয়ার জন্যই। নারী বলে সন্ধ্যার পর বাড়ির বাইরে যেতে পারবে না। নিজের ব্যক্তিস্বাধীনতার কোনো মূল্য থাকবে না। রাজনীতি, সমাজনীতি, অধিকারবোধ—এ গুলো তার থাকা অনুচিত। প্রত্যেক নারী যখন নিজেকে নারী ভাবা বাদ দিয়ে নিজেকে একজন মানুষ ভাবতে পারবে, তখনই আসলে নারীর প্রকৃত অগ্রগতি ঘটানো সম্ভব হবে।

নারীসমাজের সমস্যা হলো পুরুষতন্ত্রের মতো কখনো ক্ষমতা হাতে পেলে তার অপব্যবহার করে নিজেকেই সর্বেসর্বা করে রাখতে চাওয়ার কারণে মূলত তারা আরো পিছিয়ে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। কেউ দাস বা দাসী নয়। একে অপরের পাশে থেকে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতে হবে। বুঝতে শিখতে হবে যে ক্ষমতা যে ব্যবহার করে আসলে ক্ষমতা তার কাছে থাকে না। এ জন্য নারী-পুরুষ উভয়েরই মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। উত্তম ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে হবে। সব মানুষকে শিক্ষিত নয়, সুশিক্ষিত এমনকি স্বশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে।

সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। যদিও মানসিকতা পালটানো অনেক কঠিন কাজ এবং দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ। কিন্তু কিছু কিছু পলিসি নেওয়া যায়। যেমন গ্রামে গ্রামে টিম গঠন করে প্রতিটি পরিবারকে এ বিষয়গুলোতে সচেতন করা, সেমিনার করা থেকে শুরু করে সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে প্রতিটি ফিল্ডে গণসচেতনতা বাড়াতে হবে। মানুষের নীচু চিন্তাধারার পরিবর্তন এবং মানবিক হতে সাহায্য করতে একদল লোককে স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসতে হবে, মানুষকে বোঝাতে হবে। এভাবে দেশ, সমাজ, পরিবার এবং প্রত্যেক ব্যক্তির মানসিকতায় যদি পরিবর্তন ঘটানো যায়, তাহলেই নারীর প্রকৃত অগ্রগতি ঘটানো সম্ভব হবে। এটা দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ হলেও একসময় হয়তো আর এদেশে কোনো মেয়ে ধর্ষিতা হবে না, বরং বেগম রোকেয়ার মতো হাজারো নারী জাগরণের অগ্রদূত নব্য রোকেয়া জন্মাবে। দেশের উন্নয়নে নারীরা আরো বেশি স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে কাজ করবে এবং তাদের অবদানে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি আরো এক ধাপ বেশি এগিয়ে যাবে। সব নারী ভাববে, তারা শুধু নারী নয়, তারাও মানুষ, তারাও সমৃদ্ধি বয়ে আনতে পারে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ