বিশ্বে নোভেল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে চলেছে। এরই মধ্যে ১০০টির বেশি দেশে এই ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতালির ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষকে বাধ্যতামূলক কোয়ারেনটাইনে থাকতে বলা হয়েছে। চীনে একটি কোয়ারেনটাইন হোটেল বিধ্বস্ত হয়ে ১০ জন মারা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। খবর : আলজাজিরা, বিবিসি ও সিএনএনের।
চীনের হুবেই প্রদেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর বিশ্বে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৬০০। এর মধ্যে ৩ হাজার ১০০ জনের বেশি মারা গেছে চীনে। বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তবে চীনে মৃত্যু ও নতুন করে সংক্রমণের সংখ্যা কমেছে। উহানে আরো ২৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দেশটির স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, দেশটিতে আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৫৪ হাজার সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে। চীনের পূর্বাঞ্চলীয় কোয়াংঝো শহরে শনিবার সন্ধ্যায় একটি কোয়ারেনটাইন হোটেল ধসে এখন পর্যন্ত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ ২০ জনের সন্ধানে অভিযান চলছে। ঠিক কী কারণে হোটেলটি ধসে পড়েছে সেটি এখনো জানা যায়নি। এদিকে সিনহুয়া নিউজের এক খবরে বলা হয়েছে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ১০০ বছর বয়সি এক ব্যক্তি সুস্থ হয়ে শনিবার হাসপাতাল ছেড়েছেন।
চীনের বাইরে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে ইতালি। গতকাল জানানো হয়েছে, দেশটিতে ২৪ ঘণ্টায় আরো ৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মৃতের সংখ্যা ২৩০ ছাড়িয়েছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজার ৮৮৩ জনে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী জিউসেপ্পো কোন্তে জানিয়েছেন, প্রশাসনিক অঞ্চল লমবার্ডিসহ আরো ১৪টি প্রদেশে অন্তত ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষকে বাধ্যতামূলকভাবে কোয়ারেনটাইনে থাকতে হবে। ৩ এপ্রিল পর্যন্ত এই অবস্থা থাকবে। লমবার্ডির পুরো উত্তর অঞ্চল যেখানে ১ কোটি লোকের বাস এবং ইতালির বাণিজ্যিক নগরী মিলান লক ডাউন বা বন্ধ রাখা হবে। তবে জরুরি ভিত্তিতে কিছু করার প্রয়োজন হলে সেক্ষেত্রে নিয়মের ব্যত্যয় হতে পারে। ১৪টা প্রদেশের মধ্যে ভেনিস, পারমা এবং মোদেনা বন্ধ থাকবে। যা মোট ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলবে। এসব অঞ্চলের ব্যায়ামাগার, সুইমিংপুল, জাদুঘর এবং স্কি রিসোর্টগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে। বিয়ের অনুষ্ঠান ও শেষকৃত্যসহ ধর্মীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান স্থগিত থাকবে। যদি কেউ কোয়ারেনটাইন ভঙ্গ করে তাহলে তাকে তিন মাস জেল খাটতে হবে। জনসমাগম এড়াতে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে রবিবার প্রার্থনা করেছেন পোপ ফ্রান্সিস।
করোনা ভাইরাস ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ইরানেও। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কিয়ানুশ জাহানপুর গতকাল জানিয়েছেন, এক দিনে নতুন করে ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। মোট মারা গেছে ১৯৪ জন। নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ৭৪৩ জন। এ নিয়ে দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ৬ হাজার ৫৬৬ জনে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে রবিবার থেকে কাতিফ অঞ্চল অবরুদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব।
দক্ষিণ কোরিয়াতেও আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গতকাল দেশটির কর্মকর্তারা বলেছেন, ৩৬৭ জন নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন। সব মিলিয়ে দেশটিতে এখন ৭ হাজার ১৩৪ জন আক্রান্ত। যুক্তরাষ্ট্রে ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে গতকাল পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১৯ জনে দাঁড়িয়েছে। শুক্রবার নিউইয়র্কে ৪৪ থেকে ৮৯ জন আক্রান্ত হলে শহরের গভর্নর অঙ্গরাজ্যটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। স্যান ফ্রান্সিসকোতে একটি প্রমোদতরীর ২১ জন আক্রান্ত হওয়ার পর জাহাজটিকে ক্যালিফোর্নিয়ার অকল্যান্ডে নোঙ্গর করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি অক্সন হিলে কনজারভেটিভ পলিটিক্যাল অ্যাকশন কনফারেন্সে অংশ নেওয়া এক ব্যক্তি করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন। ঐ অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স বক্তৃতা করেন। তবে এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট বিচলিত নন বলে হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে। এদিকে ট্রাম্পের গণমাধ্যমের সমালোচনা করে বলেছেন, তারা মিথ্যা সংবাদ দিয়ে ওয়াশিংটনের পদক্ষেপকে বাজেভাবে তুলে ধরতে চাইছে।
ভারতের কেরালায় একই পরিবারের পাঁচ সদস্যের শরীরে করোনার সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এ নিয়ে দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে। কেরালা রাজ্য সরকার জানিয়েছে, ভাইরাসে আক্রান্ত ঐ পরিবারের তিন সদস্য সম্প্রতি ইতালিতে গিয়েছিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইত্তেফাকের কলকাতা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, রিপোর্ট আসার আগেই করোনা আক্রান্ত সন্দেহে ভর্তি এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে। রিপোর্ট যদি পজিটিভ হয়, তাহলে এটাই হবে ভারতে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর প্রথম ঘটনা।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনায় প্রথমবারের মতো ৬৪ বছর বয়সি এক জনের মৃত্যু হয়েছে। অস্ট্রেলিয়াতে মোট তিন জন মারা গেছে। অন্যান্য দেশের মধ্যে ফ্রান্সে ৯৪৯ জন, জার্মানিতে ৭৯৫, স্পেন ৪৪১, যুক্তরাজ্যে ২০৬, নেদারল্যান্ডসে ১৮৮ জন আক্রান্ত। ব্রিটেনে ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছেন ৬৪ জন।