ফেসবুকের অপব্যবহার ও মেয়েদের উত্ত্যক্তকরণ

আরব বসন্তের সময় বিভিন্ন দেশে সরকার পরিবর্তনে ফেসুবক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মিশরের তাহরির স্কয়ারে হোসনি মোবারকের পতনের লক্ষ্যে যে দুর্বার আন্দোলন গড়িয়া উঠে, তাহার উদ্যোক্তারা ছিলেন বেশির ভাগই তরুণ ও সোশ্যাল মিডিয়া একটিভিস্ট। এমনকি বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে শাহবাগকেন্দ্রিক যে আন্দোলন গড়িয়া উঠে, সেইখানেও আমরা সামাজিক মাধ্যমের একটি শক্তিশালী ভূমিকা লক্ষ করিয়াছি। ইহার পর অনেক জল গড়াইয়াছে। এখন সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন নেতিবাচক ব্যবহার নিয়া অনেকেই সরব ও ত্যক্তবিরক্ত। ভুয়া খবর, মিথ্যা বা কৃত্রিমভাবে বানানো ছবি, ব্যক্তিগত আক্রমণ, সাম্প্রদায়িক উসকানি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার-প্রপাগাণ্ডা ইত্যাদির হাতিয়ার হইয়া উঠিতেছে সামাজিক মাধ্যম। ইহা অনেক সময় সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ নষ্ট করিতেছে। ব্যক্তিগত জীবনে অশান্তি তৈরি করিতেছে এবং সামাজিক ও পারিবারিক ভাঙনে ইন্ধন জোগাইতেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে পর্যন্ত ভুল ছবি ব্যবহারের জন্য দুঃখ প্রকাশ করিতে হইয়াছে। খোদ ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ স্বীকার করিয়াছেন, ‘ফেসবুক একটি ভয়ংকর ভুল।’ সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ফেসবুকের ভাইস প্রেসিডেন্ট চামাথ পালিপিতিয়া তাহাদের কন্যাদের ফেসবুক ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করিয়াছিলেন। বলা বাহুল্য, এই সকল কারণে অনেক দেশে সামাজিক মাধ্যমসংক্রান্ত আইন বা নীতিমালা প্রণীত হইয়াছে।

ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমের শত নেতিবাচক দিকের মধ্যে একটি হইল, এইখানে যে কেহ তাহার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অফিশিয়াল প্রভৃতি ছবি আপলোড করিতে পারেন অনায়াসেই। টাইমলাইনে প্রকাশের মাধ্যমে ইহা বিশ্বের যে কোনো প্রান্ত হইতে যে কেহ দেখিতে পারেন। ইহাতে অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়। অনেকে হিংসা বা পরশ্রীকাতরতার কোপানলে পড়েন। সংঘবদ্ধ অপরাধীদের টার্গেটে পরিণত হন। বিশেষ করিয়া উঠতি বয়সি মেয়েরা অনেক সময় নিজের সৌন্দর্য প্রকাশ বা আপত্তিকর ছবি দিয়া থাকে, যাহা একসময় তাহার জন্য কাল হইয়া দাঁড়ায়। ফেসবুকে নিজের একান্ত ব্যক্তিগত বা খোলামেলা ছবি দেওয়ার অর্থ কি ইহা নহে যে, তাহার ব্যাপারে বাড়তি মনোযোগ আকর্ষণ করা? সোশ্যাল মিডিয়ায় এইরকম হাজার হাজার ছবি ও আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ার কারণেও দেশে উত্ত্যক্তকরণের সংখ্যা বাড়িতেছে বলিয়া অনেকে মনে করেন। ইহার দায়ভাগ কাহার?

অনেকে বলিতে পারেন, এই সকল ঘটনায় শুধু উত্ত্যক্তই করা হইয়াছে, ইহাতে আরো ক্ষতিকর কিছু ঘটিতে পারিত। প্রকৃতপক্ষে সমাজে ধর্ষণ বাড়িয়া যাওয়ার ক্ষেত্রেও সামাজিক মাধ্যমের এমন ব্যবহার কম দায়ী নহে; কিন্তু আমরা যখন দেখি এই জন্য শুধু পুরুষদেরই শাস্তি পাইতে হয়, কারাদণ্ড ভোগ করিতে হয়, তখন সেইখানে ন্যায়বিচারের অভাব আছে বলিয়া প্রতীয়মান হয়। লক্ষণীয়, মানবরচিত আইন এইখানে অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক। কেবল পুরুষের চরিত্র হরণের চেষ্টা করা উচিত নহে। সম্প্রতি পিরোজপুরের কাউখালীতে এক স্কুলছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করিবার ঘটনায় এক যুবককে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হইয়াছে। খবরের পিছনের খবর লইতে গিয়া জানা গেল, আসলে ইহা প্রেমঘটিত একটি বিষয়। অতএব, আমরা এমন বিচার চাই না এবং ফেসবুকসহ যত্রতত্র নারীর সৌন্দর্য প্রকাশে চাই সতর্কতা ও অধিকতর সচেতনতা।