সিরিয়া বিজয়ের পথে শেষ বাধা কি তুরস্ক?

২০১১ সালে শুরু হওয়া সিরিয়ার সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ সমাপ্তির পথে আপাতত তুরস্ককেই শেষ বাধা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সম্প্রতি সিরিয়া ও তার মিত্রসেনাদের সর্বাত্মক আক্রমণের মুখে  দিশেহারা সন্ত্রাসীদের সুরক্ষায় তুরস্কের ভূমিকা সবাইকে হতবাক করেছে। বেশ কিছুদিন থেকে সিরিয়া ইস্যুতে রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা তুরস্ক হঠাত্ করেই এ সংক্রান্ত আস্তানা ও শুচি চুক্তির বরখেলাপ করতে উদ্যত হয়। যা ইদলিবে শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে  আংকারার নিজ প্রতিশ্রতি পালনে অনীহাই প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। যে কারণে সন্ত্রাসী অবস্থানে সিরীয় সেনাদের বিমান হামলা বন্ধের নামে সন্ত্রাসীদের পক্ষেই অবস্থান নেয় তুরস্ক।  

এ পর্যায়ে সিরিয়া ও তার মিত্রসেনারা বিদেশি মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীদের সর্বশেষ ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পথে সিরিয়া ও তুরস্কের সেনারা সর্বাত্মক যুদ্ধের মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসে। এই পরিপ্রেক্ষিতে তুরস্ক ও সিরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ প্রায় অনিবার্য হয়ে পড়ে। এদিকে ইদলিবের সন্ত্রাসবিরোধী সামরিক অভিযানে তুরস্কের বেশ কিছু সেনা নিহত হলে পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়। মূলত সন্ত্রাসীদের ঘাঁটিতে চলা অভিযানে প্রায় তিন ডজন টার্কি সেনা নিহত হলে সিরিয়া বিষয়ে টার্কি সেনাদের ভূমিকা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। এই পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়া ইরান ও সিরিয়া সন্ত্রাসীদের ঘাঁটিতে টার্কি সেনাদের অবস্থান নিয়ে আংকারাকে ধিক্কার জানায়। টার্কি সেনাদের এই ধরনের তত্পরতাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করে রাশিয়া। এ সংক্রান্ত রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে সিরিয়া ইস্যুতে আংকারার মনোভাব নিয়ে সরাসরি আপত্তি জানিয়ে তুরস্ককে আস্তানা ও শুচি চুক্তির বাধ্যবাধকতা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। এই ব্যাপারে রাশিয়া ও সিরিয়ার অবস্থানও পরিষ্কার করে মস্কো।  এদিকে তুরস্কের কর্মকাণ্ড সিরিয়া ইস্যুতে আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর ষড়যন্ত্রমূলক ভূমিকা আরো প্রকাশ্য হয়ে উঠল। এরকম উত্তেজনাকর অবস্থানের মধ্যেই তুরস্কের পালটা আক্রমণে কয়েক জন সিরীয় সেনা নিহত হলে ইদলিব ঘিরে যুদ্ধের দামামা শুরু হয়। তুরস্কের যুদ্ধেংদেহি মনোভাবে পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে থাকলে সিরিয়া ইদলিবের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। এরপর তুরস্কের কিছু ড্রোন সিরিয়ার আকাশে অনুপ্রবেশ করলে সিরিয়ান সেনারা সেগুলোকে গুলি করে ভূপাতিত করে। অন্যদিকে তুরস্ক সিরিয়ার একটি পুরোনো মডেলের যুদ্ধবিমান টিএল-৩৯ গুলি করে নামায়। এরকম পরিস্থিতির মধ্যেই সিরিয়ার আকাশ সীমা ও তত্সংলগ্ন কৌশলগত এলাকায় টার্কি বিমানের চলাচলের ব্যাপারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে মস্কো। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে খুব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয় যে—তুরস্কের বিমানের নিরাপত্তা নিশ্চয়তাভার মস্কো আর নিতে পারবে না। অন্যদিকে ইরানের সেনাবাহিনীও টার্কি সেনাদের দায়িত্বকর্তব্য ও সীমাবদ্ধতা-সংক্রান্ত প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলে অনেকটাই চাপে পড়ে তুরস্ক। ফলে ইদলিব পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। এদিকে এই ইস্যুতে আমেরিকা ও ন্যাটো তুরস্ককে সমর্থন দিয়ে সিরিয়াকে চাপে ফেলে দেয়। যদিও ন্যাটো ও আমেরিকার চাপ অগ্রাহ্য করে সিরিয়ার সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। এরকম প্রেক্ষাপটে মাত্র দুই দিন আগে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান মস্কোতে রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ইদলিব ইস্যুতে একটি সমঝোতায় পৌঁছেন। এরপরেই সেখানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। যদিও এই যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের পথে সবার সহযোগিতা চেয়ে নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়ার উত্থাপিত একটি প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে আমেরিকা ও ব্রিটেন। অন্যদিকে রাশিয়ার মধ্যস্থতায় ইদলিবের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তুরস্ককে সতর্ক করেছেন সিরিয়া। অবশ্য এর আগে প্রেসিডেন্ট পুতিন ও প্রেসিডেন্ট আসাদের মধ্যকার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে টেলিফোনে বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এরপরেই দেশটির সেনাবাহিনী যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে চলার ব্যাপারে তুরস্ককে হুঁশিয়ার করে। এক্ষেত্রে ভবিষ্যতে যুদ্ধবিরতি শর্তের সামান্যতম অন্যথা হলে সিরিয়ান সেনারা কঠোর জবাব দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন? প্রশ্ন হচ্ছে—এই যুদ্ধবিরতি কতটা মেনে চলবে তুরস্ক?  একই সঙ্গে এই যুদ্ধবিরতির আওতায় সিরিয়ায় ক্রিয়াশীল সন্ত্রাসীদের সুরক্ষা দিতে তুরস্কও নতুন কোনো ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হবে কি না? আর এমনটি হলে পরবর্তী পরিস্থিতি কী হতে পারে?

বর্তমান দুনিয়ার আলোচিত ইস্যু সিরিয়া। ২০১১ সালে শুরু হওয়া এই সংঘাতে পরাশক্তি রাশিয়া সরাসরি জড়িয়ে পড়ে ২০১৫ সালে। ঐ সময়ের মধ্যে সিরিয়ার বেশির ভাগ এলাকাই বিদেশি মদতপুষ্ট সন্ত্রাসীদের দখলে চলে যায়। এসময় বিদ্রোহীদের হাতে নাস্তানাবুদ হতে থাকেন আসাদ বাহিনী। এ পর্যায়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দামেস্কের প্রধানমিত্র রাশিয়া সামরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সেখানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সক্ষম হন। এই প্রেক্ষাপটেই সিরিয়ার সরকার ও জনগণের মধ্যকার ঐক্য সুদৃঢ় হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে সমগ্র দেশে সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলেও ব্যতিক্রম থাকে সামান্য কিছু এলাকা। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ইদলিব। তুরস্কের সীমান্তবর্তী সিরিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ এলাকার শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত প্রধান বাধা তুরস্ক। আমরা যদি লক্ষ করি তাহলে দেখব যে—২০১৫ সালের পর কোনো এক সময় তুরস্ক রাশিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সিরিয়া ইস্যুতে পশ্চিমাদের বিপরীতে অবস্থান নেয়। যদিও আংকারা আসাদ সরকারকে শত্রু হিসেবেই বিবেচনা করে। আর গত বছর দুইয়েক ধরে তুরস্ক নানাভাবে সিরিয়া ইস্যুতে আলোচনায় থাকলেও তার ভূমিকা নিয়ে সবাই ছিলেন সন্দিহান। তুরস্কের মনোভাবের এই নগ্নতা সম্প্রতি খুব পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ইদলিবে অভিযানের প্রাক্কালেই দেশটি নিজেকে ন্যাটোর ছত্রছায়ায় নিজেকে সুরক্ষিত করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে। ইদলিবের রুশ ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেশটি তুরস্ক সীমান্তে আমেরিকান প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েনের আহ্বান জানায়। যা ছিল অতীব চমকপ্রদ খবর। কেননা যে তুরস্ক কয়েক বছর যাবত্ রাশিয়ার এস-৪০০ ব্যবস্থা পেতে মরিয়া। এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাওয়ার জন্য আমেরিকার সঙ্গে বেশ কয়েকটি সামরিক চুক্তি বাতিলের হুংকার দিয়েছিলেন। মাত্র দুই বছরের মধ্যে রাশিয়াকে চোখ রাঙানি দেখিয়ে তুরস্কের এই অবস্থান দেশটির রাষ্ট্রীয় চরিত্রকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। ভবিষ্যতে দেশটির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবাই আরো সতর্কতা অবলম্বন করবে। তবে ইদলিব ইস্যুতে তুরকের ভূমিকা খুব স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, দেশটি পশ্চিমাদের সঙ্গেই নতুন বন্ধনে জড়িয়ে পড়ছে। যে কারণে দেশটি পশ্চিমাদের সিরীয়বিষয়ক পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে যে কোনো মুহূর্তেই আবার সুর পালটাতে পারেন। এক্ষেত্রে পশ্চিমাদের উসকানির মুখে সিরীয় ভূমি দখলে রাখার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে দেশটি। এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে ইদলিব ও আশপাশের সন্ত্রাসীদের সংগঠিত করতে তুরস্কে চলমান যুদ্ধবিরতিকেও কাজে লাগাবে। মোটামোটি বেকায়দায় থাকা সন্ত্রাসীদের যতদূর সম্ভব নিরাপদ রাখার সূক্ষ্ম কৌশল বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাই এরদোগানের সাম্প্রতিক মস্কো সফরের প্রধান লক্ষ্য। সিরীয় জনগণ কিংবা দেশটির সরকারকে সহযোগিতা করার কোনো লক্ষণ তুরস্কের আচরণে লক্ষ করা যায় নি; কিন্তু সিরীয় পরিস্থিতির আরো অবনতি হওয়ার কোনো আশঙ্কাই আর নেই। দিন যত যাবে সিরিয়ার সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ ততটাই বেগবান হবে। একদিন সমগ্র সিরিয়ার দেশটির সেনাবাহিনী পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। এক্ষেত্রে তুরস্ক কোনোভাবেই সিরিয়া সংকটের গতিপথকে ভিন্ন দিকে সরাতে পারবেন বলে মনে হয় না। যে কারণে আট বছরের গৃহযুদ্ধে সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ রক্তপাত সম্পূর্ণ বন্ধ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। অন্যদিকে সিরিয়া সরকারের অনুমোদন ছাড়া যেসব বিদেশি সেনা সিরিয়ায় অবস্থান করছে তাদের তাড়িয়ে দেওয়ার সিরিয়ান সেনাদের প্রত্যয় কোনো ফাঁকাবুলি নয়। তাই বলতে হয় যে, সিরিয়ার সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের শেষ কাঁটা তুরস্ক। যা খুব সহজেই উপড়ে ফেলতে সক্ষম হবে সিরিয়া।

n লেখক: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক