আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

ক্যাম্পাস দখলে রাখতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক গ্রুপ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। এতে আতঙ্কিত সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৯ বছরে বিভিন্ন সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেও সম্প্রতি ধারালো অস্ত্র ব্যবহার বেড়েছে।

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বিকালে হলের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের সংঘর্ষ হয়। এসময় চার শিক্ষার্থীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়। ঐদিন রাতেই এ ঘটনার জের ধরে শাহজালাল নামে এক শিক্ষার্থীকে হাত-পা ও মুখ বেঁধে নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।

৫ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের শিক্ষার্থী রাফসানের উপর হামলার অভিযোগ পাওয়া যায়। গত রবিবার উপাচার্য বরাবর রাফসান লিখিত অভিযোগ করেন। এতে তিনি বলেন, উপাচার্য ভবনের সামনে হঠাত্ একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের ছাত্র হাফিজুল ইসলাম, আব্দুল হাকিম সুমন, হাসিব              শেখ সাইমুনসহ আরও দুই/তিন জন তাকে বাঁশ দিয়ে পেটায়। তার কোমর ও পায়ে আঘাত করে এবং বেধড়ক মারধর করে। এই ঘটনার আগে থেকেই রাফসানকে মারধরের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, হামলাকারীরা গণিত বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের মহিউদ্দিন আহমেদ সিফাতের অনুসারী। মহিউদ্দিন আহমেদ সিফাত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত।

গত পহেলা মার্চ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার সময় সিঁড়িতে হামলার শিকার হন গণিত বিভাগের ছাত্রী জান্নাতুল নওরীন উর্মি। হামলায় গুরুতর জখম হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে মানববন্ধনে ঐ ছাত্রীর উপর হামলার বিষয়টি গুজব বলে প্রচার করা হয়। তারা দাবি করেন, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি করে। তিন সদস্যের ঐ তদন্ত কমিটিকে বৃহস্পতিবারের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়। এদিকে ছাত্রীর পিতা অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান মৃধা সোমবার রাত ৯টায় নগরীর বন্দর থানায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের প্রভাষক সুজিত বালা, ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত শিক্ষার্থী আলিম সালেহিন, আরিফুল ইসলাম, আবদুল্লাহ ফিরোজ, মো. হাফিজ এবং আসাদুজ্জামানকে আসামি করে অভিযোগ দায়ের করেছেন।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয় পহেলা মার্চ বিকালে শিক্ষক সুজিত বালা নওরীনের পরীক্ষার খাতা জোর করে টেনে নিয়ে যায় এবং কক্ষ থেকে বের করে দেয়। এরপর সিঁড়ি থেকে নামার সময় ৮/১০ জন মুখোশধারী তার মাথায় আঘাত করে। জ্যামিতি বক্সের সুঁচালো কাটা দিয়ে বুকে-পিঠে এবং শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে খুঁচিয়ে জখম করে। এছাড়াও ক্রিকেট স্ট্যাম্প দিয়ে তলপেট, কোমর ও উরুতে আঘাত করা হয়।

তাকে প্রথমে শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজে নেওয়া হয়। পরে ঢাকায় নিয়ে উন্নত চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান মৃধা আরো জানান তার মেয়েকে ইতিপূর্বে মোবাইল ফোনে হুমকি দেওয়া হলে তিনি থানায় জিডি করেছিলেন। জিডিতে উল্লেখিত নম্বরটি ছিল ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আলিম সালেহির। তিনি এ অবস্থার প্রতিকার ও বিচার চেয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে অভিযোগ দায়ের করেছেন। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের বন্দর থানার ওসি মো. আনোয়ার হোসেন গতকাল জানান, ৯ মার্চ রাতে এ সংক্রান্ত একটি অভিযোগ পেয়েছেন। মামলা রুজুর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

­বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জানান, এখন পর্যন্ত ছাত্রলীগের কোনো কমিটি না থাকলেও রয়েছে ছাত্রলীগ পরিচয়দানকারী একাধিক ছাত্র। তারা বিভিন্ন সময়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে ক্যাম্পাসে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে থাকে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তারা পেটের মধ্যে পেপসির বোতল ঢুকিয়ে দেওয়া, হাত-পা বেঁধে নির্যাতন, ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথায় কোপ দেওয়াসহ নানা ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সুব্রত কুমার দাস জানান, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনা গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পেলেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. ছাদেকুল আরেফিন ইত্তেফাককে জানান, মাত্র চার মাস হলো তিনি যোগদান করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ফেরাতে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তিনি আরো বলেন, ২৫ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় ইতিমধ্যেই দুই শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। ৫ মার্চের অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই পরবর্তীতে মীমাংসা করে লিখিত ভাবে জানিয়ে দিয়েছে। অপর বিষয়গুলো তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পেলেই অভিযুক্তদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।