২২টি গ্রাম লইয়া গঠিত একটি ইউনিয়নে কোনো উচ্চ বিদ্যালয় নাই—উহা বর্তমান যুগে আসিয়া ভাবিতে কষ্ট হয়। অথচ ঘটনা সত্য। হাওরের জেলা সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের ২২টি গ্রামে কোনো হাইস্কুল নাই। সমগ্র ইউনিয়নে আটটি প্রাথমিক বিদ্যালয় অবশ্য আছে। ইতিপূর্বে এই ইউনিয়নে একটি জুনিয়র হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করা হইলেও কোনো শিক্ষক না থাকায় তাহা বন্ধ হইয়া গিয়াছে। ফলে, এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বহু পথ পাড়ি দিয়া ধর্মপাশা উপজেলার হাইস্কুল কিংবা পার্শ্ববর্তী নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জের বিভিন্ন হাইস্কুলে যাতায়াত করে। ২২ গ্রামের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত স্কুলে যাতায়াত করে বর্ষায় নৌকায়, আর হেমন্তে পায়ে হাঁটিয়া। অথবা, তাহাদেরকে ১০০ হইতে ১২০ টাকা খরচ করিয়া অটোতে দৈনিক আসা-যাওয়া করিতে হয়। অনেক দূরে দূরে স্কুল বিধায় অধিক খরচ হয়। অনেকেই তাহাদের সন্তানের লেখাপড়া বন্ধ করিয়া দিতে বাধ্য হন। একদিকে শিক্ষা হইতে যেমন বঞ্চিত হইতেছে এলাকাবাসী, ঠিক তেমনি অনমনীয় শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ চরমে উঠিতেছে বর্ষা মৌসুমে। ফলে, ইউনিয়নের অধিকাংশ ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার পরিধি প্রাথমিক শিক্ষার মধ্যেই আটকাইয়া যাইতেছে।
দেশে প্রসার বাড়িতেছে উচ্চশিক্ষার। যদিও শহরে যেইভাবে বাড়িতেছে, গ্রামে সেইভাবে বাড়িতেছে না। তবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে শহর-গ্রামের পার্থক্য এখন সেইভাবে নাই। বিনা মূল্যে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি উপবৃত্তি ও খাদ্য বিতরণের মতো কর্মসূচির সুবাদে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ এখন প্রায় শতভাগ। মাধ্যমিকেও বিনা মূল্যে বইসহ বিভিন্ন প্রণোদনা প্রদান করিতেছে সরকার। এই কারণে শিক্ষার এই দুই স্তরে শহর ও গ্রামের মধ্যে তেমন একটা তফাত থাকিতেছে না। তবে ইহাও সত্য যে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাক্রম হইতে শিশুদের ঝরিয়া পড়া রোধ করা যাইতেছে না। সেভ দ্য চিলড্রেনসহ শিশুদের লইয়া কর্মরত ছয়টি আন্তর্জাতিক সংস্থা রাজধানীতে শিশু অধিকার বিষয়ে গত বত্সর এক প্রতিবেদনে জানাইয়াছে, বাংলাদেশে স্কুলে ভর্তির হার শতভাগ হইলেও মাধ্যমিক পর্যায়ে আসিয়া ঝরিয়া পড়িতেছে শিক্ষার্থীরা। ঝরিয়া পড়া এই সকল শিশু বয়সে কিশোর হওয়ায় এই সময়টিতেই তাহাদের মানসিক ও শারীরিক পরিবর্তন আসে। আর জীবনের দিকনির্দেশনা না থাকায় তাহারা বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সহিত জড়াইয়া পড়ে। সম্প্রতি রাজধানীসহ সমগ্র দেশে ছড়াইয়া পড়া কিশোর গ্যাং তাহার উদাহরণ।
আর্থিক অসচ্ছলতা যেমন ঝরিয়া পড়ার কারণ, তেমনই একটি বড়ো কারণ নিকটবর্তী স্থানে উচ্চ বিদ্যালয়ের অনুপস্থিতি, সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের বেলায় যেমনটি ঘটিয়াছে। সর্বজনীন শিক্ষা নিশ্চিত করিতে সরকার দীর্ঘকাল ধরিয়া চেষ্টা করিয়া যাইতেছে, তাহার সুফলও পাওয়া যাইতেছে। ইহার মধ্যে কোনো একটি ইউনিয়নের ২২ গ্রামে এই যুগে আসিয়াও কোনো উচ্চ বিদ্যালয় থাকিবে না, ইহা কল্পনাতীত। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তারা কতটা অবহেলা করিলে এই পরিস্থিতি ঘটিতে পারে তাহা সহজেই অনুমেয়। আমরা মনে করি, হাওর, চর, নদীভাঙন এবং পার্বত্য অঞ্চলগুলিতে শিক্ষার বিস্তারে বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন। বিশেষত, মাধ্যমিক স্তরে ঝরিয়া পড়া রোধ করিতে জনবসতির নিকটবর্তী স্থানে স্কুল গড়িয়া তোলা একান্ত আবশ্যক, ইহার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থাও করা প্রয়োজন।