প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে পেল বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাত্রাবাড়ী-মাওয়া-ভাঙ্গা রুটে দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধন করেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধনকালে এটিকে জাতির জন্য মুজিববর্ষের উপহার বলে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়ো অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতুর কাজ সম্পন্ন হলে তার সর্বোচ্চ সুবিধা যাতে দেশের মানুষ পায়, সেজন্য আধুনিক মহাসড়কের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রেখে এই এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি করা হয়েছে।

এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধনের পর শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখন থেকে খুব দ্রুত টুঙ্গিপাড়া যেতে পারব। এ মাসেই আমি টুঙ্গিপাড়া যাব। তখন এক্সপ্রেসওয়ে দেখা যাবে। এর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের সব মানুষের যোগাযোগের নতুন দ্বার উন্মোচিত হলো।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ ধরনের বড়ো বড়ো প্রকল্প আমাদের বাংলাদেশের মর্যাদা আরো বৃদ্ধি করবে। এ ধরনের আধুনিক নির্মাণ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার চিত্র পালটে দেবে।’ পদ্মা সেতুর কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পদ্মা সেতুটাও কিন্তু একটা ভিন্নধর্মী সেতু। দেশে এই প্রথম দোতলা সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। এই সেতুর নিচ দিয়ে রেললাইন থাকবে, আর ওপর দিয়ে গাড়ি যাবে। পদ্মা নদীর মতো একটা খরস্রোতা নদীতে কাজ করা খুবই দুরূহ ব্যাপার এবং এর নির্মাণকাজটা বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিল। আমরা আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতু নির্মাণ করছি। আমরা আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারি—এ বিশ্বাস আমাদের আছে এবং তা প্রমাণ করে দেখানো হলো।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে জাপান গিয়েছিলেন। তখন তিনি যমুনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের কথা বলেন। জাপান সরকারকে এই সেতু নির্মাণ করার জন্য অনুরোধ করেন। জাপান সরকার এই সেতুর ফিজিবিলিটি স্টাডি করে দেয়, যার ফলে আমরা বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ করতে পেরেছি। সেই সূত্র ধরে তখন তাদের বলেছিলাম, আমরা যমুনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করেছি, এখন আমরা পদ্মা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করতে চাই। সে হিসেবে জাপান পদ্মা সেতুর ফিজিবিলিটি স্টাডি করে।’ কিছু দিন পরেই পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হয়ে যাবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা যে করতে পারি, পদ্মা সেতুর মতো একটা অবকাঠামোই বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে দেবে।’ 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ধীর গতিসম্পন্ন যানবাহনগুলো ঐ রাস্তায় চলাচল করতে পারবে। আমি নিজে গিয়ে এই রাস্তা উদ্বোধন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওখানে গেলে অনেকগুলো উদ্বোধন পিছিয়ে পড়বে। তাছাড়া আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশে বাস করছি। আমরা বলেছিলাম এই বাংলাদেশ একদিন ডিজিটাল হবে। আজ সে কথা সত্য হয়েছে। ডিজিটালের মাধ্যমে আজ এই গণভবন থেকে সারাদেশে অনেকগুলো প্রকল্প আমরা উদ্বোধন করতে পারছি। এতে আমাদের সময় সাশ্রয় হচ্ছে।’

ভ্রমণের সময় কমানোর পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর জনগণের জন্য আরামদায়ক ও নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধাসংবলিত ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। আর এর মাধ্যমে মুজিববর্ষের প্রাক্কালে বাংলাদেশ যোগাযোগ ক্ষেত্রে এক নতুন যুগে প্রবেশ করল। আন্তর্জাতিক মানের এই এক্সপ্রেসওয়ে দুটি সার্ভিস লেনের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীকে যুক্ত করবে। এখন মাত্র ২৭ মিনিটে ঢাকা থেকে মাওয়ায় যাওয়া যাবে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ওয়েস্টার্ন বাংলাদেশ ব্রিজ ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের আওতায় খুলনা, বরিশাল ও গোপালগঞ্জ সড়ক জোনে নির্মিত ২৫টি সেতু এবং তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু নির্মাণ (সংশোধিত) প্রকল্পের আওতায় ছয় লেনবিশিষ্ট আট কিলোমিটার তৃতীয় কর্ণফুলী (শাহ আমানত সেতু) সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস। 

প্রকল্পের বিবরণ অনুসারে, এক্সপ্রেসওয়েতে পাঁচটি ফ্লাইওভার, ১৯টি আন্ডারপাস এবং প্রায় ১০০টি সেতু এবং কালভার্ট রয়েছে, যা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়িয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখবে। এটিতে মাওয়া থেকে ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা এবং ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাচ্চর থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে পুরো খুলনা ও বরিশাল বিভাগ এবং ঢাকা বিভাগের একটি অংশের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। বরিশাল বিভাগের ছয় জেলা, খুলনা বিভাগের ১০ জেলা এবং ঢাকা বিভাগের ছয় জেলাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২২টি জেলার মানুষ সরাসরি এই আন্তর্জাতিক মানের এক্সপ্রেসওয়ে থেকে উপকৃত হবেন।

আধুনিক এক্সপ্রেসওয়ের দুটি অংশ ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর সঙ্গে সংযুক্ত হবে, যা বর্তমানে নির্মাণাধীন। দেশের দীর্ঘতম পদ্মা সেতুর চার কিলোমিটার মঙ্গলবার ২৬তম স্প্যান বসানোর পরে ইতিমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। ২০২১ সালের জুনের মধ্যে ট্রাফিকের জন্য ব্রিজটি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হয়ে গেলে, কোনো ভ্রমণকারীকে ভাঙ্গা থেকে ঢাকা আসা এবং যেতে এক ঘণ্টা সময় লাগবে না। এই হাইওয়েতে আগামী ২০ বছরের জন্য ক্রমবর্ধমান ট্রাফিকের পরিমাণ বিবেচনা করে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে প্রায় ১১০০৩ দশমিক ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মিত হয়েছে।