বাংলাদেশে নতুন করে কেউ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হননি। আক্রান্ত তিন জনের মধ্যে দুই জন সুস্থ, একজন দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া প্রবাসীদের দেশে না ফেরার আহ্বান জানিয়েছে সরকার। এদিকে করোনা আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশের আইসিইউ দরকার হয়। স্থানীয় পর্যায়ে আইসিইউ-এর এই চাহিদা পূরণে কি প্রস্তুত দেশ? নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে প্রস্তুতির কথা বরাবরই বলে আসছে আইইডিসিআর। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই জনবহুল দেশে যেখানে স্বাভাবিক অবস্থাতেই আইসিইউ সংকট সেখানে স্থানীয়ভাবে সংক্রমণ হলে সেই সংকট মিটবে কীভাবে?
জরুরি প্রয়োজন ছাড়া প্রবাসীদের দেশে না ফেরার আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘যারা বিদেশে আছেন তাদের প্রয়োজন ছাড়া দেশে আসার দরকার নেই। বিদেশ থেকে কেউ দেশে ফিরলে স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টাইনে থাকার আহ্বান জানান তিনি।’ গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে পাঁচটি থার্মাল স্ক্যানার হস্তান্তর অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। সামিট গ্রুপ বিদেশফেরত যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য সরকারকে পাঁচটি থার্মাল স্ক্যানার উপহার দিয়েছে। করোনা আক্রান্ত তিন জন রোগী ভালো আছেন জানিয়ে জাহিদ মালেক বলেন, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত তিন জনের মধ্যে যে দুই জন সুস্থ হয়ে উঠেছেন, তাদের যে কোনো দিন রিলিজ দেওয়া হবে। আর যাদেরকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে তারা সবাই অসুস্থ নন। আরো দুই জন কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন তাদের শরীরে পরীক্ষা করে দেখা গেছে তারা করোনায় আক্রান্ত নন। আগামী দুই দিনের মধ্যে চট্টগ্রাম, সিলেট বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম বন্দর ও বেনাপোল বন্দরে ১০টি নতুন স্ক্যানার বসানো হবে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আমাদের বিমানবন্দরে স্ক্যানারের ঘাটতি দেখা দিয়েছিল, সেটা পূরণ হয়েছে। আমরা দুই মাস আগেই পাঁচটি স্ক্যানার অর্ডার দিয়েছিলাম, সেটা গত সপ্তাহে হাতে পেয়েছি। সামিট গ্রুপ পাঁচটি দিয়েছে। ফলে বর্তমানে স্ক্যানার নিয়ে সমস্যা নেই।
জাহিদ মালেক বলেন, কোথাও কোনো রোগীর খোঁজ পাওয়া গেলে বা বিদেশ থেকে কোনো রোগী এলে তাদের ট্র্যাক করছি এবং ঘরে কোয়ারেন্টাইন করা হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখছি। তারা যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন তাহলে তাদের নিয়ে আসছি হাসপাতালে। এভাবেই আমাদের কেসগুলো চিহ্নিত হচ্ছে। হাসপাতালগুলোকে কোনো সার্ভে করা বা নিউমোনিয়া হলে করোনার টেস্ট হচ্ছে কি না জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, জ্বর, সর্দি, কাশি নিয়ে যারা আসছেন তাদের আমরা হাসপাতালে ভর্তি করছি। যাদের প্রয়োজন মনে হচ্ছে তাদের পরীক্ষা করছি করোনা আছে কি না। বিমানবন্দরে চারটি হেলপ ডেস্ক বসানো হলেও সেটা পর্যাপ্ত কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা বিমানবন্দরে ১০ জন ডাক্তার ও ৩০ জন নার্স দিয়েছি। দুই ডেস্ক থেকে চারটি করা হয়েছে। আমরা যে পদক্ষেপ নিয়েছি, আপাতত তা ভালো। বাড়ানোর প্রয়োজন হলে আরো বাড়াব।
করোনা ভাইরাস ধরা না পড়লেও যাদের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ১৪ দিনের স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হচ্ছে, তাদের ছুটি না কেটে সম্ভব হলে বাড়ি থেকে কাজ করার অনুমতি দিতে সব অফিস-দপ্তরের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে আইইডিসিআর। এদিকে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে স্কুল-কলেজের প্রাত্যহিক সমাবেশ শ্রেণিকক্ষে আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও অন্যান্য অনুষ্ঠান আয়োজন আপাতত বন্ধ রাখারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সন্দেহভাজন করোনা রোগী সম্পর্কে কথা বলবে শুধু আইইডিসিআর
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ অন্যান্য বিমানবন্দর, স্থল, সমুদ্রবন্দর এবং রেল স্টেশনে সন্দেহভাজন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেলে তাদের সম্পর্কে শুধু রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) বিশেষজ্ঞরাই কথা বলবেন। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা এ সংক্রান্ত কোনো কথা বলতে পারবেন না। সন্দেহভাজন কতজন রোগী পাওয়া গেছে, কতজনকে হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিট কিংবা কোয়ারেন্টাইন করা হয়েছে সে সম্পর্কে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং করে গণমাধ্যমকে জানাবে আইইডিসিআর।
১৭ জেলায় হোম কোয়ারেন্টাইনে ২৫৪ জন
করোনা ভাইরাস সংক্রমণ হতে পারে এমন আশঙ্কায় দেশের ১৭টি জেলায় বিদেশফেরত আড়াই শতাধিক ব্যক্তিকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। গত তিন দিনে বিভিন্ন জেলায় এ পর্যন্ত ২৫৪ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হয়। তবে এদের মধ্যে এখন পর্যন্ত কারো শরীরে করোনা ভাইরাস পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে মানিকগঞ্জে ১০৯, নারায়ণগঞ্জে ৪০, মাদারীপুরে ৩০, কিশোরগঞ্জে ৩৪, ফেনীতে ৯, ভৈরবে ৯, নোয়াখালীতে ১, যশোরে ৬, বগুড়ায় ২, নরসিংদীতে ২, খুলনায় ১, সিলেটে ১, ফরিদপুরে ৩, জামালপুরে ১, রাজবাড়ীতে ২ , ঝিনাইদহে ২, চুয়াডাঙ্গায় ১ এবং দিনাজপুরে ১ জন রয়েছেন।
আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিরা কোয়ারেন্টাইনে ভালো আছেন : আইইডিসিআর
গতকাল করোনা প্রসঙ্গ নিয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশ দেশে স্থানীয় সংক্রমণ ঘটছে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কভিড-১৯ কে বিশ্ব মহামারি ঘোষণা করেছে। তাই যে দেশে আছেন যেখানে আছেন সেখানেই অবস্থান করাই উত্তম। কারণ আরোহণ, ট্রানজিট ও অবতরণের বিমানবন্দরসমূহের টার্মিনাল এবং বিমানের ভেতরে যে কোনো যাত্রী/ ক্রু কভিড-১৯ সংক্রমিত যাত্রী/ ক্রু দ্বারা সংক্রমিত হতে পারেন। তিনি বলেন, ঢাকা মহানগরীর ছয়টি হাসপাতালে ৪০০ শয্যা, চট্টগ্রাম মহানগরীতে দুইটি হাসপাতালে ১৫০ শয্যা, সিলেট মহানগরীতে দুইটি হাসপাতালে ২০০ শয্যা, বরিশাল মহানগরীতে দুইটি হাসপাতালে ৪০০ শয্যা এবং রংপুর মহানগরীতে দুইটি হাসপাতালে ২০০ শয্যা আইসোলেশনের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।