প্রতি বছর দেশের খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম থাকে গড়ে ৩০ থেকে সর্বোচ্চ ৪০ টাকার মধ্যে। কিন্তু গত বছর সেপ্টেম্বরে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণার পর তা লাফিয়ে লাফিয়ে ২৬০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়। এতে বিপাকে পড়ে স্বল্প আয়ের মানুষ। টনক নড়ে দেশের কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কৃষি ও বাণিজ্যমন্ত্রী পেঁয়াজ উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে মৌসুমে আমদানি বন্ধের চিন্তার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু এখন ভরা মৌসুমেই পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দিল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস বন্ধ থাকার পর আগামীকাল রবিবার থেকে আবার পেঁয়াজ রপ্তানি শুরু করছে ভারত। দেশের পেঁয়াজ আমদানিকারক ব্যবসায়ীরাও আগামীকাল ভারত থেকে পেঁয়াজ আসছে বলে জানিয়েছে। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে দেশের পেঁয়াজচাষিরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় পেঁয়াজচাষিদের লোকসানের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং পেঁয়াজ উত্পাদনে উত্সাহিত করতে আমদানিকৃত পেঁয়াজে শুল্ক আরোপের সুপারিশ করে ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন সম্প্রতি একটি সুপারিশমালা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। কৃষকের উত্পাদন ব্যয়ের সঙ্গে নির্ধারিত পরিমাণ মুনাফা (সম্ভাব্য ২০ শতাংশ) যুক্ত করে প্রতি কেজি পেঁয়াজ স্থানীয় বাজারে বিক্রয়মূল্য হিসেবে এ শুল্ক আরোপ করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখন কোনো শুল্ক আরোপ ছাড়াই পেঁয়াজ আমদানির এ অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
করোনা ভাইরাসসংক্রান্ত কোনো জটিলতা না থাকলে আগামীকাল থেকে দেশে ভারতীয় পেঁয়াজ আসছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ বিভাগে আমদানির অনুমতি চেয়ে করা আবেদনের অনুমোদন দেওয়ায় বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরের ব্যবসায়ীরা।
হিলি স্থলবন্দরের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর থেকে বন্দরের আমদানিকারকরা এ পর্যন্ত প্রায় ২৫ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন।
হিলি স্থলবন্দরের পেঁয়াজ আমদানিকারক মোবারক হোসেন ও সেলিম উদ্দিন জানান, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকার পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়ে ২ মার্চ এ- সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে। এরপর বন্দরের ১০-১২ জন আমদানিকারক ২৫ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি চেয়ে উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ বিভাগে আবেদন করেন। এর আগেও হিলি স্থলবন্দর ছাড়াও অনেক বন্দরের আমদানিকারকরা আবেদন করেন। তারা আরো জানান, এর আগে করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দেড় হাজার টনসহ নতুন করে বন্দরের পাঁচ জন আমদানিকারকের ৮ হাজার টনের পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দিয়েছে কৃষি উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ বিভাগ। এর ফলে আশা করা হচ্ছে আগামী ১৫ মার্চ থেকে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি শুরু হবে।
এদিকে জানতে চাইলে হিলি স্থলবন্দরের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের রোগতত্ত্ববিদ মো. মাহামুদুল হাসান বলেন, ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতির বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো চিঠি আসেনি। তবে পেঁয়াজ আমদানি করা হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পণ্যটির ছাড় দেওয়া হবে।
এদিকে দেশের বাজারে এখন কমতির দিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির দাম। গতকাল রাজধানীর খুচরাবাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হয়। সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) তাদের গতকালের খুচরা বাজারদরের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজে ৩০ টাকা ও আমদানিকৃত পেঁয়াজে ২০ টাকা কমেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, এখন যদি ভারত থেকে পেঁয়াজ আসা শুরু হয় তাহলে দেশের পেঁয়াজচাষিরা ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়বে। কারণ, এবার পেঁয়াজের উত্পাদন খরচ বেশি পড়েছে। আর ভারত গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি বন্ধ করার পর পেঁয়াজের দাম বেশি থাকায় চাষিরা লাভের আশায় বেশি পরিমাণ জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করেছে। এ অবস্থায় চাষিরা যদি লোকসানের মুখে পড়ে তাহলে তারা পেঁয়াজ আবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।
উল্লেখ্য, প্রতি বছর দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২৫ থেকে ২৭ লাখ টন। এর মধ্যে ১৫ লাখ টন দেশে উত্পাদন হয়। বাকি চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। কিন্তু কৃষক যদি নায্যমূল্য পায় তাহলে পেঁয়াজ উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সময়ের ব্যাপার মাত্র।