করোনার সঙ্গে তাপমাত্রার সম্পর্কের সত্য-মিথ্যা

চরমভাবে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থার দ্রুত উন্নতি হয়েছে। গবেষকদের মতে, শীতকাল হওয়ায় চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় মহামারি আকার ধারণ করেছিল করোনা ভাইরাস। দেশ দুটিতে ধীরে ধীরে শীত শেষ হয়ে বসন্ত আসতে শুরু করায় করোনা ভাইরাসে নতুন করে আক্রান্ত হওয়ার হার কমছে। তাই বিশেষজ্ঞরা তাপমাত্রার সঙ্গে করোনার বিশেষ যোগসূত্র প্রমাণের চেষ্টা করছেন। তবে কেউ-ই এখনো নিশ্চিত করে দাবি করছেন না যে, কোভিড-১৯ ভাইরাসটি শীতকালীন ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো আচরণ করবে। তাদের মতে, বসন্ত এলে অর্থাত্ তাপমাত্রার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার হার কেমন হয় তার ওপরই নির্ভর করছে পুরো বিষয়টি। অর্থাত্ বসন্তেও যদি করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব একই রকম থাকে তাহলে তা ফ্লুর বৈশিষ্ট্যের বাইরে চলে যাবে এই করোনা ভাইরাস।

ঋতু পরিবর্তনের সময় বা শীতকালীন ইনফ্লুয়েঞ্জায় সাধারণত ০ দশমিক ১ শতাংশের কাছাকাছি সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্তু করোনা ভাইরাসে এখন পর্যন্ত মৃত্যুর হার ২ থেকে ৩ শতাংশের মতো, যা ফ্লুর চরিত্রের সঙ্গে অনেকটাই সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু অন্য ফ্লুতে আক্রান্তদের চিকিত্সা পদ্ধতি জানা থাকলেও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর নির্দিষ্ট চিকিত্সা পদ্ধতি, রোগ নিরোধক বা মৌসুমি টিকা না থাকার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি।           বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নোভেল করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নড়েচড়ে বসে গোটা বিশ্ব। সংক্রমণ ঠেকাতে দেশে দেশে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় বিশেষজ্ঞরা প্রত্যাশা করছেন, ভাইরাসটি ফ্লুর মতো আচরণ করবে এবং উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রাদুর্ভাব কমে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চিকিত্সা গবেষক নেলসন মাইকেল বলেন, ‘এটি শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাস এবং এগুলো ঠান্ডা আবহাওয়ায় নির্দিষ্ট কারণে আমাদের জন্য সমস্যা তৈরি করে। শীতে আমরা সবাই দরজা-জানালা ইত্যাদি বন্ধ করে ঘরের ভেতরে থাকি। ফলে আমরা প্রায়ই এ সময়কে ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু মৌসুম বলি।’

বিজ্ঞানীদের মতে, শীতকালে সাধারণত ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ থাকে বলে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। এছাড়া এ সময়ে লোকজন কাছাকাছি থাকে তাই যে কোনো ফ্লু বেশি ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। এমনকি বৃষ্টির মৌসুমেও এ ধরনের ফ্লু বেশি ছড়াতে পারে। ইনফ্লুয়েঞ্জা ঠান্ডা ও শুষ্ক অবস্থায় সতেজ হয়। ফলে উত্তর গোলার্ধে শীতকালকে অনেক সময় ফ্লু মৌসুম বলা হয়।

নেলসন মাইকেলের ধারণা, করোনা ভাইরাস ফ্লুর মতো আচরণ করতে পারে এবং আবহাওয়া উষ্ণ হয়ে উঠলে হয়ত প্রাদুর্ভাব কমে যেতে পারে। কিন্তু তিনি সতর্ক করে বলছেন, আবার যখন শীত ফিরে আসবে তখন ভাইরাসটিও ফেরত আসতে পারে। আশার কথা, বিভিন্ন দেশের সরকার ও জনগণের অভূতপূর্ব পদক্ষেপের ফলে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কমে আসছে।

বিশেষজ্ঞরা করোনা ভাইরাসের সঙ্গে তাপমাত্রার একটি যোগসূত্র প্রমাণের চেষ্টা করলেও কেউ কেউ আবার এ-ও বলেছেন যে, শুধু তাপমাত্রা বেশি হলেই যে করোনার প্রাদুর্ভাব ঘটবে না সেটি নিশ্চিত করে বলা যাবে না। কারণ সিঙ্গাপুরে শতাধিক মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। সিঙ্গাপুরে সাধারণত সারাবছর গরম ও উষ্ণ-আর্দ্র আবহাওয়া বিরাজ করে। অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনায় এখন গ্রীষ্মকাল চলছে; কিন্তু এসব দেশেও অনেক মানুষের করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া বসন্তেও যদি বিশ্বের অধিকাংশ দেশে করোনা ভাইরাস এখনকার মতো আচরণ করে তবে তা নিঃসন্দেহে ভয়ংকর ঘটনা হিসেবে প্রতীয়মান হবে।

করোনা ভাইরাস গোত্রের অনেক ভাইরাস রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র সাতটি ভাইরাস মানুষের ক্ষতি করতে সক্ষম। এ সাতটির চারটি আবার শুধু মানুষের মৃদু ঠান্ডার জন্য দায়ী। বাকি তিনটি ভাইরাস খুবই শক্তিশালী এবং প্রাণঘাতী; এদের আরেকটি বাজে বৈশিষ্ট্য হলো এরা এক জনের শরীর থেকে আরেক জনের শরীরে সংক্রমিত হতে পারে। এই তিন ধরনের করোনা ভাইরাস বাদুড় কিংবা উটের মতো প্রাণীর মাধ্যমেও মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে সক্ষম। আলোচিত কোভিড-১৯ ভাইরাস রোগটির ভাইরাসের নাম সার্চ-কভ-২। প্রোটিন এবং নিউক্লিক অ্যাসিড দিয়ে গঠিত করোনা ভাইরাসের দেহ। তবে অ্যালকোহলের মতো স্যানিটাইজারের দ্বারা করোনা ভাইরাসের দেহ বিনষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া সূর্যের আলোতে আল্টা ভায়োলেট রশ্মিতে যে কোনো ধরনের ভাইরাসের দেহ বিনষ্ট হয়। 

বিশ্বের সবচেয়ে আক্রান্ত এলাকাগুলোর একটি উহান। উহান থেকে শুরু করে ইরান, ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়া প্রায় বা কাছাকাছি অক্ষাংশে অবস্থিত এবং তাপমাত্রা ও সংশ্লিষ্ট আর্দ্রতার সামঞ্জস্য রয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব ম্যারিল্যান্ডের গবেষকরা এই শহরগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশ্বের অন্যান্য স্থানে সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়টি অনুসন্ধানের চেষ্টা করছেন। যদিও গবেষণাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে গবেষণায় এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট জলবায়ুগত পরিস্থিতি ভাইরাসটির বিস্তার ঠেকানোর বিষয়ে নিশ্চিত হতে না পারলেও তা যে বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে তা মোটামুটি নিশ্চিত। গবেষকরা বলেছেন, একই ধরনের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও অক্ষাংশ ভাইরাসটির বিস্তারের সময়ে সামঞ্জস্যতা দেখা গেছে। এছাড়া এসব স্থানের বছরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা চক্রে মিল পাওয়া গেছে।

নিউ ইয়র্কের সিরাকাস ইউনিভার্সিটির জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ব্রিটানি মুশ বলেন, ‘মানুষকে সংক্রমণ করে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অপর করোনা ভাইরাসগুলো ঋতুনির্ভর। উত্তর গোলার্ধে শীতে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা সর্বাধিকে পৌঁছায়। তবে আমরা জানি না এই করোনা ভাইরাস ঋতুকালীন ধারা অনুসরণ করবে কিনা।’ রুটগার্স নিউ জার্সি মেডিক্যাল স্কুলের সংক্রমণ রোগের গবেষক ডেডিভ সেনিমো বলেছেন, ‘অনেক বিশেষজ্ঞ প্রত্যাশা করছেন গ্রীষ্মে আক্রান্তের সংখ্যা কমে যেতে পারে।’ অবশ্য সেনিমো ও মুশ উভয়েই সতর্ক করে বলেছেন, যাতে ভৌগোলিক তথ্যের ভিত্তিতে উপসংহার টানা না হয়। তারা ইঙ্গিত করছেন ভাইরাসটি সম্পর্কে অনেক কিছুই অজ্ঞাত। তাদের বক্তব্য, করোনা ভাইরাস যদি ঋতুকালীন হয় তাহলে আমরা আবহাওয়া উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত এবং অজ্ঞাত আক্রান্তদের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রত্যাশা করতে পারি। তবে কোভিড-১৯ ঋতুকালীন প্রবণতা অনুসরণ করবে কিনা তা বলার সময় এখনো আসেনি।’ তাদের প্রত্যাশা, উষ্ণ আবহাওয়ায় করোনা ভাইরাস মোকাবিলা তুলনামূলক সহজ হবে। তবে উষ্ণ আবহাওয়ায় করোনা রোগীর সংখ্যা কমে আসলেও সেটির অর্থ এই নয় যে, করোনা ভাইরাস আর ফিরে আসবে না।

—সূত্র সিএনএন ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক