ঘুম বিষয়ে আমরাই ঘুমাইয়া রহিয়াছি

বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, পৃথিবীর শহুরে রাত্রি এখন আর অন্ধকারাচ্ছন্ন নহে। বরং কৃত্রিম আলোর দ্যুতিতে দিশাহারা পৃথিবীর প্রাকৃতিক রাত্রি। কিন্তু এই যে কৃত্রিম আলোয় আমরা রাতকে দিন বানাইয়া ফেলিতেছি, তাহার ফল কতটা হিতকর, বিশেষ করিয়া এলইডি প্রযুক্তি আসিবার পর? বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, রাত্রিতে এলইডি আলোর যথেচ্ছ ব্যবহার আমাদের ঘুম কমাইয়া দিতেছে। জন্ম দিতেছে নানা রকমের শারীরিক সমস্যার। এলইডি দিনের মতো উজ্জ্বল আলোর বিচ্ছুরণ ঘটানোর কারণে মানুষের দেহঘড়ির হরমোন ধরিয়া নেয়, তখনো রাত্রি হয় নাই, দিনের আলো রহিয়া গিয়াছে—সুতরাং ইহা ঘুমাইবার সময় নহে।

ঘুমের ব্যাপারে সবচাইতে বড়ো ট্র্যাজেডি হইল—ঘুমানোকে অনেকে আলস্যের প্রতীক হিসাবে দেখেন। কিন্তু বাস্তবতা হইল, আমাদের দেহঘড়ির ছন্দ চলে ঘুমের নির্দিষ্ট বরাদ্দের মাধ্যমে। এই ক্ষেত্রে জীবনের তিন ভাগের এক ভাগ বরাদ্দ ঘুমের জন্য। এই বরাদ্দের হেরফের ঘটিলে কত ধরনের সমস্যা হইতে পারে, তাহা লইয়া আধুনিক জীবনের বেশির ভাগ মানুষেরই চিন্তা করিবার সময় নাই। অথচ শহুরে জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ঘুমসংক্রান্ত কোনো না কোনো সমস্যায় জর্জরিত; এবং সিংহভাগই জানেন না যে, সমস্যাটি আদতে ঘুমের। স্লিপ মেডিসিনের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, লোকে ঘুম লইয়া সচেতন নহে বিধায় দৈনন্দিন জীবনে ঘুমকেই সবচাইতে বেশি অবহেলা করে। অথচ ঘুমের সুস্বাস্থ্যের জন্য ঘড়ি ধরিয়া ঘুমাইতে যাওয়া ও উঠিয়া পড়া সবচাইতে জরুরি। কারণ, নির্দিষ্ট সময়ে নিয়ম করিয়া ঘুমাইলে স্ট্রেস, টেনশন, ভুলিয়া যাওয়া, খিটখিটে হইয়া পড়া, উদ্বেগ, গ্যাস্ট্রাইটিস ইত্যাদির মতো নিত্যকার সমস্যা জীবন হইতে দূর হইতে বাধ্য। এই ক্ষেত্রে ঘুমাইতে যাইবার অনেক আগে হইতেই টিভি, ট্যাব, মোবাইল ফোন ইত্যাদির নীল আলো হইতে নিজেকে দূরে রাখা ভীষণ জরুরি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হইল, ঘুম না আসিলে আমরা বরং মোবাইল ফোন ঘাঁটাঘাঁটি করি, অন্ধকার ঘরে টিভি দেখি—যা নিশ্চিতভাবেই ঘুমকে আরো দূরে ঠেলিয়া দেয়। সুতরাং বিছানায় যাইবার ২০ মিনিটের মধ্যে ঘুম না আসিলে বিছানা ছাড়িয়া বরং বই পড়া, গান শুনা বা অন্য কোনো অবসরকালীন কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখা উচিত। ঠিকমতো ঘুম হইলে সকালে মাথা ধরা, কাজের ফাঁকে প্রবল ঘুম পাওয়া, মনোযোগে ঘাটতি, অকারণ বিরক্তি আর দেখা দিবে না।

ঘুমের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ক্ষেত্রে রাতে নীল আলোর দূষণ সবচাইতে বড়ো সমস্যা। আলোর দূষণের ব্যাপারে উন্নত বিশ্বের মানুষ কিন্তু বেশ কয়েক বত্সর ধরিয়া ক্রমশ সতর্ক হইতেছেন। এমন দিনও আসিতে পারে, যখন ধনী দেশগুলির মানুষ রাত্রির আকাশকে আরো বেশি অন্ধকার দেখিতে চাহিবেন। ঘরেও রাখিতে চাহিবেন জমাট অন্ধকার। বিষয়টি শুনিতে বিলাসিতা বলিয়া মনে হইতে পারে, কিন্তু আমাদের দেহঘড়ির ওপর বাস্তবিকই জবরদস্তি চলে না। আর জবরদস্তি চালাইলে তাহার ফল যে ভালো হয় না, তাহা নূতন করিয়া বলিবার অপেক্ষা রাখে না। আসলে ঘুমের বিষয়ে আমরা এখনো ঘুমাইয়াই রহিয়াছি। এই ঘুম ভাঙা দরকার।