আধুনিক শাস্তির উদাহরণ

অপরাধের ধরনের উপর নির্ভর করিয়া শাস্তির নানা মাত্রা রহিয়াছে। আদিম কাল হইতেই শাস্তির বিধান প্রচলিত রহিয়াছে মানবসমাজে। যুগে যুগে শাস্তি প্রদানের ধরন ও দর্শনে পরিবর্তন আসিয়াছে, তবে সমাজ ও আধুনিক রাষ্ট্র হইতে শাস্তির বিধান লুপ্ত হইয়া যায় নাই। শাস্তি প্রদানের উদ্দেশ্য হইল অপরাধ প্রতিরোধ, পুনর্বাসন, সামাজিক সুরক্ষা, অপরাধীকে নিবৃত্ত করিয়া তোলা, অপরাধের প্রতিফল নিশ্চিতকরণ, শিক্ষা প্রদান, ভীতি প্রদর্শন ইত্যাদি। শাস্তির বিধান কেবল জাগতিক সীমার মধ্যে সীমিত নহে, প্রায় সকল ধর্ম অনুসারে মৃত্যু-পরবর্তী কালে পৃথিবীতে কৃতকর্মের জন্য ফল ভোগ করিতে হইবে। এরই প্রভাবে অপরাধ এবং শাস্তি মানব মনস্তত্ত্বের বিরাট জায়গা দখল করিয়া আছে। যুগে যুগে শাস্তির ধরনে পরিবর্তন আসিয়াছে। প্রাচীন ও মধ্যযুগের শাস্তির ধরনগুলি ছিল নির্মম; তখন শাস্তির বিধান হিসাবে ছিল নির্বাসন, শিরশ্ছেদ, জীবন্ত পুড়াইয়া মারা, ক্রুশারোহণ, ডুবাইয়া মারা, বিষপানে হত্যা, পাথর ছুড়িয়া হত্যা, অঙ্গহানি, প্রহার ইত্যাদি। ইহা ছাড়া আধুনিক যুগের সূচনাপর্বে কিছু শাস্তি প্রচলিত ছিল যেইগুলির কিছু কিছু এখন বাতিল হইয়া গিয়াছে বা যাইতেছে; যেমন,  ইলেকট্রিক চেয়ারে বসাইয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, ফায়ারিং স্কোয়াড, গ্যাস চেম্বার, গিলোটিন, ফাঁসিতে ঝুলানো, প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রদান ইত্যাদি। বর্তমানে আধুনিক রাষ্ট্রে আমরা ‘চোখের বদলে চোখ’—এই গোত্রবিধান হইতে অনেকটা সরিয়া আসিয়াছি। শাস্তি প্রদানের দর্শনেও পরিবর্তন আসিয়াছে। উন্নত রাষ্ট্রসমূহে শাস্তি এখন আর দৃষ্টান্তমূলক নহে বরং সংশোধনমূলক।

সম্প্রতি আমাদের দেশে সংশোধনমূলক শাস্তি প্রদানের এক অভিনব উদাহরণের সৃষ্টি হইয়াছে। ১৯ হইতে ২৪ বছর বয়সি ৯ তরুণের অপরাধ ছিল মাদক সেবন, প্রচলিত আইন অনুসারে তাহাদের শাস্তি হইতে পারিত তিন মাসের কারাভোগ। কিন্তু তাহার পরিবর্তে মাগুরার বৈচারিক আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট তাহাদের বই পড়িতে, সিনেমা দেখিতে ও গাছ লাগাইতে নির্দেশ দিয়াছে। এক বছর এই তরুণদের সমাজসেবা কার্যালয়ের প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে থাকিতে হইবে। তাহাদের মানিয়া চলিতে হইবে কিছু শর্ত। কোনোরূপ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ানো যাইবে না। শর্ত ভঙ্গ করিলে ভোগ করিতে হইবে তিন মাসের কারাদণ্ড। আদালত চারটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইয়ের নাম উল্লে­খ করিয়া দিয়াছে, যাহা তাহাদের পড়িতে হইবে, দেখিতে হইবে দুইটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র, লাগাইতে হইবে দুইটি বনজ ও তিনটি ফলদ গাছের চারা। আদালতের এই নির্দেশনা অন্যদের ক্ষেত্রেও অনুসরণীয় হইতে পারে। এই বয়সের তরুণদের শাস্তি হিসাবে কারাভোগ প্রদান করিলে কারাগারে তাহাদের অন্য দাগি আসামিদের সংস্পর্শে আসিয়া আরো অপরাধপ্রবণ হইয়া উঠিবার সম্ভাবনা তৈরি হয়; ইহাতে শাস্তি প্রদানের মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হইয়া যায়। এখন তাহাদের যে শাস্তি প্রদান করা হইয়াছে তাহাতে সংশোধনের ভালো সুযোগ সৃষ্টি হইবে। আধুনিক সংশোধনমূলক এই সাজাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। এই ধরনের শাস্তি সমাজকেই উপকৃত করিবে।