অনুমেয়ভাবেই আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকিবার নকশা বাস্তবায়নের পথে হাঁটিতে শুরু করিয়াছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বর্তমান বিধান অনুসারে তিনি ২০২৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকিবেন। তবে এইবার যেই পরিকল্পনা চলিতেছে, তাহা বাস্তবায়িত হইবার পরে তিনি ২০৩৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকিতে পারিবেন। তত দিনে পুতিনের বয়স হইবে ৮৩ বত্সর। ইহার পরেও ক্ষমতায় থাকিতে চাহিলে তিনি কী করিবেন, তাহা অবশ্য ভবিতব্যের হাতে ছাড়িয়া দিতে হইবে।
কিছুদিন পূর্বে পুতিন এক প্রকারের রাজনৈতিক বৈরাগ্যের আভাস প্রদান করিতেছিলেন। সোভিয়েত আমলের মতো এক জনের হস্তে সারা জীবনের মতো ক্ষমতা কুক্ষিগত হওয়া ঠিক নহে বলিয়াও তিনি আওয়াজ করিয়াছিলেন। অতঃপর তাহার আসল পরিকল্পনা প্রকাশ পাইয়াছে গত মঙ্গলবার। আইনসভা দুমাতে মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টার মধ্যে পুতিন তাহার ভবিষ্যত্ পাকা করিয়া লইবার রাস্তা উন্মুক্ত করিয়াছেন। অধিবেশনের শুরুতে কোনো ব্যক্তি যাহাতে দুইবারের অধিক প্রেসিডেন্ট না থাকিতে পারেন, সেই বিধানের জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব করিয়াছেন আইনসভার এক সদস্য। পাশাপাশি আবার পুতিনকে ২০২৪ সালের পরে আরো দুইবার প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিবার বিধান রাখিবার প্রস্তাবও করা হইয়াছে। এইভাবে সংবিধান সংশোধনীর অর্থ হইতেছে, পুতিন যে এইবার লইয়া দুইবার প্রেসিডেন্ট থাকিতেছেন, তাহা আর ধর্তব্যের মধ্যে আসিবে না। পুতিন দুমাতে আসিয়া ‘নীতিগতভাবে’ এই প্রস্তাবকে সমর্থন জানাইয়াছেন। তবে এই সংশোধনী সাংবিধানিক আদালত ও গণভোটের মাধ্যমে প্রস্তাব পাশ করাইতে হইবে বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন। অতঃপর যথারীতি সংশোধনীটি পাশ হইয়া যায়। সাংবিধানিক আদালত পুতিনের মতের বাহিরে যাইবার প্রশ্নই উঠে না। আর গণভোটে যে এই সংশোধনী পাশ হইবেই, তাহা সকলেই জানে। এত অবিশ্বাস্য দ্রুততায় এত নিখুঁতভাবে দুমাতে ঘটনাটি ঘটিয়াছে যে টিমটিম করিয়া জ্বলিতে থাকা বিরোধীরা সামান্য নড়াচড়া করিবার সময় পর্যন্ত পান নাই। তাহাদের কেহ একজন পুরো প্রক্রিয়াটিকে ‘সামরিক অভ্যুত্থানের’ সহিত তুলনা করিলেও এই সামান্য সমালোচনাতে এতটুকু আলোড়নও দেখা যায় নাই।
পুতিন কেমন করিয়া এই সকল করিতে পারিতেছেন তাহা এক প্রশ্ন বটে। তবে এই কথা ঠিক যে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা আনয়নে তাহার সাফল্যের কারণে জনগণের বড়ো একটি অংশের মধ্যে পুতিনের অনুপস্থিতিতে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা লইয়া আশঙ্কা রহিয়াছে। বিশেষ করিয়া সোভিয়েত আমলে দুঃখ-কষ্ট ভোগকারী প্রজন্মের মধ্যে এই অনুভূতি প্রবল। তাহারা গণতন্ত্র কিংবা উদারীকরণের স্থলে উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতায় আস্থা রাখিতেছে। তবে মুদ্রার উলটা পিঠও রহিয়াছে। রাশিয়ার নূতন প্রজন্ম, অর্থাত্ যাহারা পুতিনের রাশিয়া ব্যতীত অন্য কোনো রাশিয়া দেখে নাই, তাহারা কিন্তু মাঝেমধ্যেই এইখানে-ঐখানে প্রতিবাদ কর্মসূচির মাধ্যমে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে শুরু করিয়াছে। ইহারা বয়সে যত বাড়িবে, পুতিন ততই চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়িবেন বলিয়াই অনেকের অনুমান। তবে সেই দিন কত দিনে আসিবে, তাহা কে বলিতে পারে?