এ আগুন আমার বুকে

তানভীর আহমেদ রাসেল

রানা একজন টোকাই। দিনরাত এক করে ঝড়, বৃষ্টি কিংবা রোদে পুড়ে তিন বেলা খাবারের বন্দোবস্ত করতে পারুক বা না পারুক বস্তিতে তার চিরচেনা ছোট্ট ঘরটিতে ফিরে আসে। সারাদিনের বিরামহীন কাজের শেষে একটু প্রশান্তির ছোঁয়া পায় এখানে। কিন্তু আজ রানা তার বস্তিকে দেখতে পেল সম্পূর্ণ এক নতুন আয়োজনে। রানার দুই চোখ যতদূর যায়, শুধু দেখতে পায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে বস্তিতে। সেই সঙ্গে হাজারো কণ্ঠের আর্তনাদে কান ভারী হয়ে আসছে রানার। টলমল করে রানার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে। রানার চোখের এক এক ফোঁটা পানি যেন মাটিতে ভূমিকম্পে রূপ নিয়েছে। রানা একটি রূপক চরিত্র। বাংলাদেশে বস্তির এমন চিত্র কিংবা রানাদের মতো হাজারো রানাদের আর্তনাদ এক নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন বস্তিতে বেশ কয়েকটি আগুনের ঘটনা পর পর ঘটেছে। সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত রূপনগর বস্তিতে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে। গণমাধ্যম থেকে জানতে পারি, বস্তিতে প্রায় ২ হাজার বসতঘর ছিল এবং বেশির ভাগই আগুনে পুড়ে গেছে। ঐ বস্তিতে মোট ২০ হাজার মানুষ বসবাস করত। দাউ দাউ করে আগুনের ছবিও প্রকাশ পেয়েছে।

গত এক বছরে শুধু রাজধানীতেই অন্তত চারটি বস্তিতে আগুন লেগেছে। আগুন লাগার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে অবৈধ গ্যাস কিংবা বৈদ্যুতিক সংযোগের কারণেই আগুন লাগার প্রাথমিক কারণ হিসেবে দাবি করা হয়। সঙ্গে সঙ্গেই গঠন করা হয় কয়েক সদস্যের তদন্ত কমিটি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই তদন্তের প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না। তদন্ত কমিটি কিংবা তাদের তদন্তের ফলাফল ফাইলের পর ফাইলে চাপা পড়ে থাকে বছরের পর বছর। বস্তিবাসী জানতে পারে না আগুন লাগার প্রকৃত কারণ কিংবা রহস্য কী? কিন্তু বারবার  এমনটা  কেন হচ্ছে?

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একশ্রেণির অসাধু চক্র নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বস্তিতে আগুন লাগানোর মতো ঘটনা ঘটাতে পারে। তাদের হীনস্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য তারা রীতিমতো বস্তির মানুষগুলোর সঙ্গে তামাশা করেই যাচ্ছে। তাদের প্রয়োজনে ওপরতলাতে বসেই কখনো বস্তির মানুষগুলোকে বানাচ্ছে মাদকসেবী, ছিনতাইকারী কিংবা খুনি। কখনো আবার তাদের মাথার শেষ ছাউনিটি পুড়ে বানাচ্ছেন গৃহহীন।

আমি এক আমজনতা। বস্তির মানুষগুলোর এমন দুর্দশা দেখে হতাশায় মুখ লুকানো ছাড়া তো আর কিছুই করার থাকে না! বস্তিতে আগুনের রেশ তাদের পাশাপাশি আমার মতো নিশ্চয়ই জনসাধারণের বুকে লাগে, লাগে মানবতার বুকে।

বস্তির নিম্ন আয়ের মানুষগুলোও এ দেশের অর্থনীতির অন্যতম এক চালিকাশক্তি। তারাও এ দেশের নাগরিক। তাদের নিরাপদ জীবনের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তাদের সঙ্গে তামাশাকারীর হাত যতই লম্বা হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা ও বস্তির মানুষগুলোর একটি নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল জীবন নিশ্চিতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

n লেখক :শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়