স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী
এক ভারতীয় নাগরিক রাজশাহী ভিসা ও পাসপোর্ট অফিসে নিজের পাসপোর্ট করিয়েছেন। এ ঘটনা জানাজানি হলে পাসপোর্ট অফিস থেকে তার সব নথিপত্র গায়েব করে দেওয়া হয়। তবে অভ্যন্তরীণ তদন্তে বিষয়টি ধরা পড়েছে। অবৈধ এই কাজের সঙ্গে সাত জনের সম্পৃক্ততা উঠে এসেছে তদন্তে।
এদের মধ্যে দুই কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে তার আগেই হাফেজ আহম্মেদ (৪৯) নামের ঐ ভারতীয় সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছেন। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার আট জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
এর আগে বুধবার দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলার অনুমোদন দেয়। পরদিন প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী সংস্থার সমন্বিত রাজশাহী জেলা কার্যালয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলার এজাহারে হাফেজ আহম্মেদকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। তার বাবার নাম মোহাম্মদ হোসেন। মা জয়নব বেগম। মামলার এজাহারে তাকে একজন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ ২০১৭ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশের ঠিকানায় হাফেজকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়।
মামলার আসামিরা হলেন—ভারতীয় নাগরিক হাফেজ আহম্মেদ, রাজশাহী বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের তত্কালীন সহকারী পরিচালক আবজাউল আলম, উচ্চমান সহকারী দেলোয়ার হোসেন, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আলমাস উদ্দিন, সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর আব্দুল ওয়াদুদ, অফিস সহায়ক হুমায়ন কবির, এমএলএসএস রঞ্জু লাল সরকার এবং দপ্তরি ইব্রাহিম হোসেন।
এদের মধ্যে আবজাউল আলম বর্তমানে যাত্রাবাড়ী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক। দেলোয়ার আগারগাঁও অফিসের সুপারিনটেনডেন্ট। আর আলমাস উদ্দিন জয়পুরহাট, আব্দুল ওয়াদুদ রাজশাহী এবং ইব্রাহিম গোপালগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে কর্মরত। হুমায়ুন ও রঞ্জু সাময়িক বরখাস্ত আছেন।
এজাহারে বলা হয়, ২০১৭ সালের ৬ জুন হাফেজ আহম্মেদ রাজশাহী নগরীর ছোটবনগ্রাম এলাকার ঠিকানা ব্যবহার করে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। ব্যাংক ড্রাফট না থাকলেও পরদিন এমএলএসএস রঞ্জু লাল সরকার আবেদনটি গ্রহণ করে নিজের হেফাজতে রাখেন। সেদিনই গিয়াস উদ্দিন নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে এই পাসপোর্ট করে দেওয়ার ব্যাপারে তার অবৈধ লেনদেনের চুক্তি হয়। পরে নগরীর ১৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে রঞ্জু নিজেই ভারতীয় হাফেজের জন্মসনদ তৈরি করেন এবং ১৩ জুন তিনি ৩ হাজার ৪৫০ টাকা ব্যাংক ড্রাফট করেন। পরে রঞ্জু আবেদনটি দেলোয়ারকে দেন। দেলোয়ার ৩১ জুলাই পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য আবেদনটি মহানগর পুলিশের বিশেষ শাখায় পাঠান। পরবর্তীতে পুলিশের প্রতিবেদনে হাফেজকে ভারতীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
কিন্তু পুলিশের প্রতিবেদন কম্পিউটার সিস্টেমে ইনপুট করেননি অফিস সহকারী হুমায়ুন কবীর। তাই ১৬ আগস্ট আবেদনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গৃহিত হয়ে যায়। ৩০ আগস্ট সহকারী পরিচালক আবজাউল আলম অফিসের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আলমাসের মাধ্যমে হাফেজের আবেদনপত্রে বাড়ির নম্বর পরিবর্তন করে চূড়ান্তভাবে আবেদনপত্রটি গ্রহণ করেন। শুরু হয় পাসপোর্ট তৈরির কার্যক্রম। গত ৭ সেপ্টেম্বর রেকর্ডকিপার ইব্রাহিমের ইউজার আইডি থেকে পাসপোর্ট ডেলিভারি করা হয়। রঞ্জু লাল সরকার নিজেই পাসপোর্টটি গ্রহণ করে হাফেজ আহম্মেদকে দেন। এরপর ভিসা নিয়ে ২০১৮ সালের ২৪ জানুয়ারি হাফেজ সৌদি আরব চলে যান। পরে তিনি আর বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন কী না এ রকম কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
দুদক জানিয়েছে, মোটা অঙ্কের উেকাচের বিনিময়ে পুলিশি প্রতিবেদন গোপন করে অবৈধভাবে পাসপোর্টটি দেওয়া হয়েছে। পাসপোর্ট প্রস্তুত হয়ে যাবার পর হাফেজের সব রেকর্ডপত্র গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। তবে বিষয়টি ধরা পড়লে পরবর্তীতে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর তদন্ত করেছে।
অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু নোমান মো. জাকির হোসেন ও ডাটা সেন্টারের অ্যাসিসটেন্ট মেইনটেনেন্স ইঞ্জিনিয়ার মাহমুদুল হাসানের সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি এই ঘটনার জন্য পাসপোর্ট অফিসের সাত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দায়ী করেন। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দুই জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, অভিযোগ পেয়ে প্রথমে দুদক অনুসন্ধান করে। এ সময় প্রাথমিকভাবে বিষয়টির সত্যতা পাওয়া যায়। এরপর কমিশন মামলা অনুমোদন করে। এরপর মামলা হয়। আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্র প্রস্তুত করবেন। উক্ত পাসপোর্ট ইস্যুর সঙ্গে আর কারও সম্পৃক্ততা থাকলে সেও আইনের আওতায় আসবে।