চলতি বত্সরের পঞ্চম শ্রেণির প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) ও অষ্টম শ্রেণির জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষার ফলাফল সমপ্রতি প্রকাশিত হইয়াছে। পাসের হার বৃদ্ধি ছাড়াও এবার এই দুই পরীক্ষার রেজাল্ট সার্বিকভাবে সন্তোষজনক। ফলে দেশ জুড়িয়া কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা যাইতেছে। সামাজিক মাধ্যমেও সেই আনন্দ-অনুভূতির ব্যাপক বহিঃপ্রকাশ রহিয়াছে। অর্থাত্ এই দুই পর্যায়ের পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দ প্রকাশের এক বড় উপলক্ষ হিসাবেও আবির্ভূত হইয়াছে। আবার যাহারা পরীক্ষায় খারাপ করিয়াছে বা সামান্য পয়েন্টের জন্য জিপিএ-৫ পায় নাই, তাহাদের জন্য ইহাই হইয়া দাঁড়াইয়াছে গভীর মনোবেদনার কারণ। তবে সার্বিকভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায়, পিইসি-জেএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ইতিবাচক প্রভাবের দিকটিও উপেক্ষা করিবার মতো নহে। গত সোমবার গণভবনে এই দুইটি পরীক্ষার ফলাফলের সারসংক্ষেপ গ্রহণকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই দুই স্তরের পরীক্ষার যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে বলিয়াছেন যে, এইসব পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে সাহায্য করিতেছে। তাহারা পরীক্ষার পর হাতে একটা সার্টিফিকেট পাইতেছে, যাহা তাহাদের পড়াশুনায় আরও মনোযোগী করিতেছে।
সন্দেহ নাই যে, এই দুইটি পরীক্ষা সার্বিকভাবে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াইতে ও তাহাদের পরীক্ষার ভীতি কাটাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিতেছে। পক্ষান্তরে যাহারা পরীক্ষায় ব্যর্থ হইতেছে বা তুলনামূলকভাবে খারাপ করিতেছে, তাহাদের কাউন্সিলিং করা শিক্ষক ও অভিভাবকদের একান্ত দায়িত্ব। কেননা এই দুইটি পরীক্ষাই তাহাদের জীবনের জন্য সবকিছু নহে। যাহারা পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে এই পাবলিক পরীক্ষা নেওয়ার ঘোর বিরোধী তাহাদের যুক্তি হইল, শিক্ষা হইতে হইবে আনন্দদায়ক। অথচ এই দুই পরীক্ষা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করিতেছে। তাহাদের অধিকাংশ কেবল পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য পড়িতেছে, শেখার জন্য নহে। জিপিএ-এর ফাঁদে পড়িয়া যেনতেনভাবে মুখস্থ করিয়া পরীক্ষার বৈতরণী পার হইতেছে। আবার কেহ কেহ এমনও মনে করেন যে, এই দুই পর্যায়ের পরীক্ষা আমাদের কোচিং ও শিক্ষাবাণিজ্যকে আরো উসকাইয়া দিতেছে। এইজন্য তাহারা এই দুই পরীক্ষা বাতিলের পক্ষপাতী। কিন্তু ইহা মুদ্রার এক পিঠ মাত্র। মুদ্রার অপর পিঠটিও ভালো করিয়া পাঠ করিতে হইবে। এই দুই পরীক্ষার ফলে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির ভুয়া সার্টিফিকেট লইয়া তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির অথবা সেই মানের গ্রেডের চাকুরি-বাকুরিতে অনুপ্রবেশের আশঙ্কা দূর হইয়াছে। এই মানের সরকারি-বেসরকারি সেবায় মানোন্নয়নেরও সম্ভাবনা দেখা দিয়াছে।
প্রধানমন্ত্রী ইহাও স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন যে, সকলেই তো আর উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করিবে না। অনেকেই কারিগরি শিক্ষা বা তাহাদের অন্য যেসব দক্ষতা রহিয়াছে, সেইসব উপযোগী পেশায় চলিয়া যাইবে। পরিবারের তাগিদে কেহ কেহ দ্রুত নিজের কর্মসংস্থান করিয়া নিবে। এইক্ষেত্রে এই এক-দুইটি সার্টিফিকেট তাহাদের জীবন চলার পথে সহায়ক হইবে। এমনকি বিদেশেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বোর্ডের এই সার্টিফিকেট তাহাদের কাজে লাগিবে। আমাদের কর্মীদের দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়া অযথা কোনো প্রশ্ন উঠিবে না। সবদিক বিবেচনায় রাখিয়া পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা যাহাতে কোমলমতি শিশুদের উপর কোনোভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলিতে না পারে সেইদিকেও সতর্ক নজর রাখিতে হইবে।