দেশে দেশে দূষণ ভয়াবহ মাত্রায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন দূষণ (বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণ, মাটিদূষণ,পানিদূষণ, বর্জ্যদূষণ) নিয়ন্ত্রণে যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা সে ধরনের যথাযথ ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে দেশগুলো ব্যর্থ হচ্ছে। তবে সিঙ্গাপুর, নেপাল, শ্রীলংকা, লাওস, ভুটান, ইন্দোনেশিয়ার মতো অনেক দেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক উন্নতি করেছে। পৃথিবীব্যাপী এখন দূষণকে দেখা হচ্ছে ‘বিপর্যয়’ হিসেবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক প্রতিবেদন মতে, বিশ্বে প্রতি চারজনের মধ্যে অন্তত একজনের মৃত্যু হয় পরিবেশগত দূষণের কারণে। সংস্থার তথ্যমতে, প্রতিবছর সারা পৃথিবীতে বায়ুদূষণে মারা যায় প্রায় ৪২ লাখ মানুষ। বিশ্বব্যাংকের সম্প্রতি এক তথ্যমতে, বাংলাদেশে বায়ু, পানি ও পরিবেশ দূষণের কারণে বছরে ক্ষতি হয় প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকা (যা মোট দেশজ উত্পাদনের প্রায় ৩ ভাগ)। মূলত বায়ুতে ক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম বা পার্টিকুলেট ম্যাটার ২.৫-এর পরিমাণ যত বেশি সে শহর তত বেশি দূষণে জর্জরিত (যদিও পিএম ২.৫-এর মাত্রা ২০-এর বেশি হওয়া উচিত নয়)। বড় বড় শহরগুলোতে ‘পিএম ২.৫’ দূষণের কারণে মানুষের ফুসফুস থেকে দূষিত বায়ু সরাসরি রক্তে প্রবেশ করছে। দূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে শিশুরা।
সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণে জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। সমুদ্রে তিমি মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর পেটে যাচ্ছে প্লাস্টিক। প্লাস্টিক ও পলিথিনের রয়েছে ‘অনন্ত আয়ু’। প্লাস্টিক ও পলিথিন দ্রব্যের ব্যবহার কমাতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এখন এসব পণ্যের ওপর কর বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি কাগজের ব্যাগ অথবা বার বার ব্যবহার করা যায় এমন ব্যাগের ওপর গুরুত্বারোপ করছে। এ ছাড়া প্লাস্টিকের রিসাইক্লিং-এর ওপরে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ায় প্লাস্টিক দূষণ ঠেকাতে জনগণকে উত্সাহিত করা হচ্ছে। তথ্যমতে, প্রতিবছর পৃথিবীতে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। বিশ্বের অন্যতম দূষিত শহর বেইজিং বায়ুদূষণ রোধে ইতোমধ্যে বেশ কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে। বেইজিং শহরের রাস্তা থেকে প্রায় বেশিরভাগ ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণে জোর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চীন বায়ুদূষণের প্রভাব নির্ণয়ে জাতীয় নেটওয়ার্ক স্থাপন ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে। ‘পিএম ২.৫’ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করবে এই নেটওয়ার্ক। জাপান শিল্প বিনিয়োগের প্রায় ২৫ ভাগ অর্থ পরিবেশ দূষণ রোধে ব্যয় করে। এখন সময় হয়েছে বিশ্বের অন্যতম পরিবেশ দূষণকারী দেশ (বাংলাদেশ) হিসেবে দূষণ রোধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার। গৃহস্থালি বায়ুদূষণ রোধে দূষণমুক্ত জ্বালানি এবং সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। প্রশ্ন হলো—বিশ্বের অন্যতম পাট উত্পাদনকারী দেশ হয়েও বাংলাদেশ কেন নিষিদ্ধ ও পরিবেশের শত্রু পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পচনশীল ও পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যাগের ব্যবহার বাধ্যতামূলক ও জনবান্ধব করতে পারছে না? দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ হয়েও তা দেদারসে চলছে। দরকার হলে পলিথিন ব্যাগের ওপর বেশি কর বসিয়ে সেই করের টাকা পাটের ব্যাগের ওপর ভর্তুকি দিয়ে পাটের ব্যাগের দাম সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে।
ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশে প্লাস্টিক সামগ্রীর উত্পাদন ও চাহিদা দিন দিন বাড়বে! তাই এর রি-সাইক্লিংয়ের ওপর জোর দিতে হবে। যদিও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করে থাকে এমন হাজার হাজার ভাঙারির দোকান গড়ে উঠেছে। প্লাস্টিক প্রক্রিয়াকরণ কারখানাগুলো এই প্লাস্টিকের বোতল কুচি কুচি করে বিদেশে রপ্তানি করে থাকে। তাই প্লাস্টিক প্রক্রিয়াকরণ কারখানা শিল্পের বিকাশে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। এ ছাড়া দূষণ নিয়ন্ত্রণে শহরে ব্যক্তিগত গাড়ি কমাতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর দিতে হবে। বর্জ্যের দূষণ রোধে নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলার ওপর গুরুত্বারোপ ও রি-সাইক্লিংয়ের ওপর জোর দিতে হবে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদনের ব্যবস্থার ওপর জোর দিতে হবে। বায়ুদূষণ রোধে ইটভাটার আধুনিকায়ন করতে হবে। এ ছাড়া পরিবেশবান্ধব নির্মাণ সামগ্রীর ব্যবহার বাড়াতে হবে। পরিবেশ দূষণের দায়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ছাড় দিলে চলবে না। সহজ কথায়, আইন প্রয়োগে কঠোর হতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে দূষণ নিয়ন্ত্রণ তথা সার্বিক পরিবেশ রক্ষা করে এগিয়ে যেতে না পারলে নাতিশীতোষ্ণ বাংলাদেশ চরমভাবাপন্ন বাংলাদেশে পরিণত হতে বেশি সময় লাগবে না!
n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়