মাদক লইয়া সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করিয়াছে আরো দুই বত্সর পূর্বেই। ইতিমধ্যে বহু মাদক ব্যবসায়ী ধরা পড়িয়াছে, ক্রশফায়ারে নিহত হইয়াছে অনেকে। ইহাতে প্রচলিত কিছু মাদকের সহজলভ্যতা কমিয়াছে। যদিও মাদকের চোরাস্রোত পৃথিবীর কোনো দেশই সহজে থামাইতে পারে না। মাদক নির্মূলে বিশ্বের অত্যন্ত ধনী দেশগুলিও ফি বত্সর কোটি কোটি ডলার খরচ করিয়া থাকে। তাহার পরও রক্তবীজের ঝাড়ের মতো মাদক কখনো নির্মূল হয় না। এমনকি একটি জনপ্রিয় মাদক দুর্লভ হইয়া পড়িলে সেই স্থানে দখল নেয় নূতন কোনো মাদক। সম্প্রতি বাজারে প্রচলিত কিছু সহজলভ্য ঔষধকেও এই সুযোগে নূতন মাদকের জায়গা দখল করিয়া লইতে দেখা যাইতেছে। মারণনেশা ইয়াবার বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা হইতেছে কিছু ব্যথানাশক ট্যাবলেট। ইয়াবা বা হেরোইন যেইভাবে সেবন করা হয়, একই পদ্ধতিকে সেবন করা হয় এই ট্যাবলেট। এইগুলি বাজারে সহজলভ্য এবং দামও কম বিধায় নূতন এই নেশায় আসক্ত হইয়া পড়িতেছে অনেক কিশোর-তরুণসহ যুবকের একাংশ। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদক হিসাবে ব্যবহূত এই সকল ট্যাবলেট বাজার হইতে প্রত্যাহার করিয়া লইতে দুই মাস পূর্বে নির্দেশ দিয়াছে ঔষধ প্রশাসন।
আমরা লক্ষ করিতেছি, একটি নেশার দ্রব্য দুর্লভ হইয়া পড়িলেও যাহারা নেশায় আসক্ত তাহারা যে কোনোভাবেই হউক বিকল্প কিছু একটার ব্যবস্থা ঠিকই করিয়া লয়। কিছু ঔষধের পাশাপাশি এইভাবেই কখনো-সখনো টিকটিকির লেজ, কেরোসিন তৈল, আঠা, সাপ প্রভৃতি নেশার বিকল্প হইয়া উঠে। প্রশ্ন হইল, নেশা কেন করিতেই হইবে? নেশা করিবার কিছু একটা কেন চাই-ই চাই? মাদকাসক্তরা কি জানে না, মাদক মানুষের বিবেক বা বোধশক্তিকে নষ্ট করিয়া দেয়? তাহারা কি দেখে নাই সর্বনাশা নেশার কবলে পড়িয়া তাহার আশপাশেই অনেক পরিবার ধ্বংস হইয়া গিয়াছে? মাদকাসক্তের কারণে এবং নেশার চাহিদা মিটাইতে গিয়া একজন মানুষ বাহ্যজ্ঞানশূন্য হইয়া কী না করিতে পারে! চুরি, ডাকাতি, খুন, ছিনতাইসহ কোনো অপরাধ করিতেই কুণ্ঠিত হয় না মাদকাসক্তরা। ইহা এখন সকলেই জানেন; কিন্তু মাদকাসক্তির জন্য রহিয়াছে অনেক কারণ। কোথাও সেই কারণ হতাশা, কোথাও অভাব, কোথাও-বা দুশ্চিন্তা। কেহ কেহ বন্ধুবান্ধবের খপ্পরে পড়িয়া শখের বশেই মাদকের প্রতি প্রাথমিকভাবে আসক্ত হয়। তাহার পরও ক্রমশ সকল ধরনের নেশায় জড়াইয়া পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক জটিলতা, অভিভাবকের অবহেলা ইত্যাদি বিষয়ও অল্পবয়সি ছেলেমেয়েদের নেশার দিকে ঝুঁকাইয়া দেয়।
অর্থাত্—সার্বিকভাবে জীবনের অনিশ্চয়তা, পরিবেশের কুপ্রভাব ও নিষিদ্ধ কাজের প্রতি উন্মাদনা, কৌতূহল, অহমিকা, দারিদ্র্য এবং অর্থের প্রাচুর্যও প্রাণবন্ত যুবসমাজকে মাদকের দিকে ঠেলিয়া দিতে পারে। সুতরাং সমাজের এই সকল সমস্যা আগে নির্মূল করিতে হইবে। তখন মাদক এবং বিকল্প মাদকের প্রতি আসক্তি এমনিতেই কমিয়া আসিবে।