যুক্তরাষ্ট্র-তালেবান শান্তিচুক্তি এবং ভবিষ্যত্ আফগানিস্তান

মো. রাশেদ আহমেদ

মূলত তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনা শুরু হয় কাতারের রাজধানী দোহায় ২০১৮ সালের শেষের দিকে। যার চূড়ান্ত চুক্তির পর্যায়ে উপনীত হয় ২০২০ সালে ২৯ ফেব্রুয়ারির একটি বিশেষ দিনে। এই চুক্তি দীর্ঘ দেড় যুগের রক্তক্ষয়ী  যুদ্ধের অবসানের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের শান্তিচুক্তির উল্লেখযোগ্য বিষয়বস্তু হচ্ছে—এখন থেকে সব ধরনের হামলা বন্ধ রাখবে তালেবান, তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা জুড়ে আল-কায়েদা জঙ্গি সংগঠনকে বা সশস্ত্র শক্তিগুলোকে তারা আর সহযোগিতা করবে না, আগামী ১৪ মাসের মধ্যে আফগান থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো সকল ধরনের সৈন্য প্রত্যাহার করবে, প্রাথমিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যসংখ্যা চার-পাঁচ মাসের মধ্যে ৮-৯ হাজার নামিয়ে আনবে। বাকি সৈন্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করবে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে তালেবান বন্দিদেরও ছাড়তে হবে। উল্লেখ্য, প্রায় ৫ হাজার তালেবান যোদ্ধা ন্যাটো বাহিনীর হাতে বন্দি আছে। আফগান সরকারের সঙ্গে (বন্দিবিনিময়) আলোচনা অব্যাহত রাখা। এছাড়া তালেবানদের ওপর থেকে সরবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং আফগানিস্তান থেকে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে জাতিসংঘ। এর ফলে এরই মধ্যে  তালেবানরা বিশ্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছে। দীর্ঘ দেড় যুগের আফগান যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম নয়। ধরা হয়, ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর আফগান যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। এ যুদ্ধে শুধু মার্কিন সেনা নিহতের সংখ্যা  প্রায় ২ হাজার ৪০০। এছাড়া ব্রিটেনের ৪৪৫ ন্যাটোর ১ হাজার ৪০০ এবং অন্যান্য  প্রায় ১ হাজার ১০০ সেনা নিহত হয়েছেন। অপরদিকে আহত সৈন্যের সংখ্যা ২০ হাজারের অধিক। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসেব মতে, ২০০১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর ৫৮ হাজার সদস্য নিহত হয়েছেন। বেসরকারি হিসেব মতে, যুদ্ধে প্রায় ২ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বাস্তুহারা হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যমতে, ২০০১ থেকে ২০১৯ যুক্তরাষ্ট্রের খরচ ৯৭৫ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া আফগান যুদ্ধে নিয়োজিত সৈন্যদের  পেছনে প্রায় ১০ লাখ ডলার ব্যয় করছে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া অনানুষ্ঠানিক খরচ মিলিয়ন ডলার। যা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর বড়ো চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ শান্তিচুক্তির ফলে আফগান যুদ্ধ অবসানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে আর বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হবে না। যা তাদের আগামীর অর্থনীতিকে আরো বেশি শক্তিশালী করবে সে কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তবে প্রশ্ন হচ্ছে এ শান্তিচুক্তির মাধ্যমে আফগানিস্তানে কি আদৌ দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।

বিশ্লেষকদের অভিমত, আফগানিস্তানে ভবিষ্যত্ দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভূ-রাজনীতি ও তালেবানদের সঙ্গে আগামীদিনের আফগান সরকারের সম্পর্ক বড়ো ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ৫ হাজার তালেবান যোদ্ধাদের মুক্তি দেবে আফগান সরকার। উপরোক্ত চুক্তির বড়ো অনিশ্চয়তার মাঝেও আফগান সরকার এরই মধ্যে ১ হাজার ৫০০ তালেবান  যোদ্ধার মুক্তির ঘোষণা নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। সেইসঙ্গে প্রতিদিন ১০০ জন তালেবানকে মুক্তি দেবে আফগান সরকার। বিনিময়ে মুক্তিপ্রাপ্ত তালেবানরা আর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। এরই মধ্যে তালেবানরা ১ হাজার আফগান সেনাকে মুক্তি দিতে রাজি হয়েছে। উল্লেখ্য, তালেবানদের এখন পর্যন্ত শক্তিশালী অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে পাকিস্তান, ইরান এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এমন কী ইরান এবং পাকিস্তান এ দুই দেশে প্রায় ৩০ লাখ আফগান শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে। যা পরবর্তী তালেবানদের রাজনীতিতে এসব দেশ শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রাখতে দৃঢ় প্রত্যয় থাকবে। এছাড়া এসব অঞ্চলে আগামীতে বৈশ্বিক সন্ত্রাস দমনে তালেবানদের ভূমিকা কি হবে তার সুস্পষ্ট রূপরেখা উল্লেখ নেই। যা ভবিষ্যতে মাথাব্যথার বড়ো কারণ হিসেবে দাঁড়াতে পারে। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে তালেবানদের সখ্যতা বহু পুরোনো। আফগানিস্তানে একটি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আফগান সরকারের সঙ্গে তালেবানদের রাজনীতির আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে। যেখানে আগামীতে তালেবানের রাজনীতি অবস্থান,অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা বা আগাম নির্বাচন  নিয়ে আলোচনা হতে পারে। আলোচনার টেবিলে অবশ্যই উভয়পক্ষকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। শান্তির স্বার্থে আগাম ভবিষ্যত্ আফগানবাসী একটা জাতীয় সরকারের প্রয়োজন উপলব্ধি করছে। তবে দেশটিতে বর্তমান নির্বাচনের চেয়ে জরুরি হচ্ছে রাজনীতির অচল অবস্থা নিরসন,  বেসরকারি প্রশাসন শক্তিশালী করা, যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নবযৌবন দান, ভঙ্গুর অর্থনীতি শক্তিশালী করা, সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি সকল রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ করা। তাহলে নিঃসন্দেহে অদূর ভবিষ্যতে আফগানবাসী যুক্তরাষ্ট্র এবং তালেবান ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া