পাঁচ মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্বে ঘাটতি ২৩ হাজার কোটি টাকা

সরকারের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না। বরং জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজস্ব সংক্রান্ত কার্যক্রমে কিছুটা গতি মন্থরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়ে। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রথম পাঁচ মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আদায় কম হয়েছে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে ১ লাখ ১ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৭৮ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা। অর্থাত্ গত পাঁচ মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় রাজস্ব আদায় কম হয়েছে ২৩ শতাংশ। তবে গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে আদায় বেড়েছে ৪ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা বা ছয় শতাংশের কাছাকাছি। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বছরের শুরুতে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি কিছুটা কম হতে পারে। কিন্তু এত কম প্রবৃদ্ধি হওয়ার প্রকৃত কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না তারাও। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে এনবিআর হয়ত রাজস্ব আদায়ে মাঠ পর্যায়ে সেভাবে জোরাজুরি করছে না। আবার কিছু খাতে ভ্যাট-ট্যাক্স ছাড় দেওয়া হয়েছে। এটি একটি কারণ হতে পারে। তবে এত কম হারে রাজস্ব প্রবৃদ্ধির কারণ স্পষ্ট নয়। তিনি বলেন, সরকার বলে অনেক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তার ফল তো রাজস্ব আদায়ে দেখতে পাওয়ার কথা। জিডিপি’র সঙ্গে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি তাল মেলাতে না পারা জিডিপি প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। গত বছর একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ১৭ শতাংশের উপরে থাকলেও এবার তা ৬ শতাংশে নেমে আসবে কেন।

এদিকে রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় চিন্তিত এনবিআরও। সূত্র জানায়, গত রবিবার সেগুনবাগিচায় রাজস্ব ভবনে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক সভায় কম হারে রাজস্ব আদায় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন খোদ এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। এ সময় তিনি মাঠ কর্মকর্তাদের কাছে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় না হওয়ার কারণ জানতে চাওয়ার পাশাপাশি অসন্তোষও প্রকাশ করেন।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফিল্ড অফিস থেকে কাঙ্ক্ষিত হারে আমদানি শুল্ক আসছে না বলে জানা গেছে। অথচ গত কয়েক মাসে আমদানি প্রবৃদ্ধিও ভালো। আমদানির ভালো প্রবৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও আলোচ্য সময়ে শুল্ক আদায়ের প্রবৃদ্ধি তাল মেলাতে পারেনি। ফলে আমদানির আড়ালে অর্থপাচার হচ্ছে কিনা-সে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব ক্ষেত্রে অভিযোগের তীর সংশ্লিষ্ট মাঠ অফিসের শুল্ক ও ভ্যাট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও।

অবশ্য এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরও বিশাল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবসম্মত নয়। ফলে লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যবধান দেখা যাবে। এছাড়া নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার কিছু জনসম্পৃক্ত খাতে ভ্যাট-ট্যাক্স ছাড় দেওয়া হয়েছে। এলএনজি আমদানিতে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক ছাড় দেওয়ায় প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা কম আদায় হবে। এছাড়া ইন্টারনেট ব্যবহারে ভ্যাট ছাড়, তৈরি পোশাকসহ সব ধরনের রপ্তানিতে করহার কমানো হয়েছে। ফলে রাজস্ব আদায় আরও কমে গেছে। এছাড়া শিগগিরই রপ্তানি খাতের ওপর ফের উেস কর কমানো হচ্ছে। ফলে আগামী মাসগুলোতে রাজস্ব আদায়ে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অবশ্য কারণ যা-ই হোক রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি এত কমে যাওয়ার যৌক্তিক কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না এনবিআরের কর্মকর্তারাও। যদিও গত বছরের একই সময়ে তত্কালীন এনবিআর প্রশাসন রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যানে কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানোর অভিযোগ করছেন কেউ কেউ।

এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, গত পাঁচ মাসে আয়কর আদায় বেড়েছে প্রায় আট শতাংশ। তবে ভ্যাট আদায়ে প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে কম, মাত্র তিন শতাংশের সামান্য বেশি। আর আমদানি শুল্ক আদায় বেড়েছে প্রায় ছয় শতাংশ।