১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের একুশ দফার উনিশ নম্বর দফায় বলা হইয়াছিল: ‘পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র লাহোর-প্রস্তাবভিত্তিক হইবে এবং কেন্দ্রে মাত্র তিনটি বিষয় থাকিবে যথা: পররাষ্ট্র, দেশরক্ষা ও কারেন্সি।’ লক্ষণীয় যে, গ্র্যান্ড ন্যাশনাল কনভেনশন কেন্দ্রীয় বিষয় হইতে মুদ্রা বাদ দিলেও যুক্তফ্রন্টের একুশ দফায় আবার মুদ্রা যোগ করা হইয়াছিল। পাকিস্তানের ঐক্যের প্রতীকরূপেই তা করা হইয়াছিল। তার সাথে অর্থনীতির কোনো সম্পর্ক ছিল না।
১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগ ছয়-দফা পেশ করেন। এতে অপর দুইটি বিষয় সম্বন্ধে পূর্ব-পূর্ব ম্যানিফেস্টো ঠিক রাখিয়া শুধু মুদ্রার ব্যাপারে দুইটি অলটারনেটিভ দেওয়া হইয়াছে। একটাতে মুদ্রাকে কেন্দ্রীয় ও অপরটাতে মুদ্রাকে ইউনিটের বিষয় করা হইয়াছে। সুতরাং দেখা যাইবে, আওয়ামী লীগ ১৯৪৯ সালে যা বলিয়াছিল এবং গত একুশ বছর ধরিয়া পূর্ব বাংলার সমবেত জনমত যে দাবি করিয়া আসিতেছে, ছয়-দফায় ঠিক সেই কথাটিই বলা হইয়াছে। রেভিনিউ ও ট্যাক্সেশন সম্বন্ধে ছয়-দফায় যা বলা হইয়াছে, সেটাও কোনো নতুন কথা নয়। আগের-আগের দফায় যে কথাটা উহ্য ছিল, ছয়-দফায় সেই কথাটাই ব্যক্ত করিয়া বলা হইয়াছে। একাধিক কারেন্সি ও রিজার্ভ ব্যাংক দুনিয়ার আরো দেশে আছে। খোদ ইংলন্ডেও স্কটল্যান্ডের জন্য স্বতন্ত্র কারেন্সি। ছয়-দফায় কেন্দ্রকে ট্যাক্সের অধিকার না দিয়া তাকে ইউনিটের খয়রাতের উপর নির্ভরশীল করা হইয়াছে, কথাটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। ফেডারেল সরকার প্রত্যক্ষভাবে নাগরিকদের উপর ট্যাক্স ধার্য করিতে পারিবেন না সত্য, কিন্তু ইউনিটের উপর ট্যাক্স ধার্য করিতে পারিবেন। বর্তমানেও সরকার কর্পোরেশন ট্যাক্সের বেলা সংস্থার মেম্বরদের উপর ট্যাক্স না ধরিয়া প্রতিষ্ঠানের উপর ধরিয়া থাকেন। ছয়-দফা অনুসারে কেন্দ্রীয় সরকারও তাই করিবেন। শাসনতন্ত্রে এ বিষয়ে স্পষ্ট বিধান থাকিবে। কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট পার্লামেন্টে আলোচনার সময়েই কোন ইউনিটের দেয় কত, তা নির্ধারিত হইবে। প্রত্যেক ইউনিট সে টাকা দিতে বাধ্য থাকবে। আদায়ও হইয়া যাইবে শাসতান্ত্রিক বিধানমতেই। ইউনিট সরকার যখন যে ট্যাক্স ও রেভিনিউ আদায় করিবেন, সে আদায়ী টাকার নির্দিষ্ট শতকরা অংশ অটোমেটিক্যালি স্টেট ব্যাংক বা রিজার্ভ ব্যাংকে কেন্দ্রীয় ও ইউনিট সরকারের নামে জমা হইয়া যাইবে। ইউনিট সরকারের নামে জমা টাকায় যেমন কেন্দ্রীয় সরকার হাত দিতে পারিবে না, কেন্দ্রীয় সরকারের নামে জমা টাকায় তেমনি ইউনিট সরকারও হাত দিতে পারিবেন না। বিদেশি মুদ্রা সম্পর্কেও এমনি ব্যবস্থা থাকিবে। এমন বিধানে কেন্দ্র ইউনিটের চাঁদার উপর নির্ভরশীল হইলেন কেমন করিয়া? বরঞ্চ আদায়ী খরচার হাত হইতে মুক্ত হইয়া কেন্দ্রের সব টাকাই সুনিয়োজিত হইতে পারিবে।
কাজেই দেখা গেল, আওয়ামী লীগ ছয়-দফা পেশ করিয়া কেন্দ্রকে অর্থবিত্তহীন দুর্বল ফকির বানাইয়া পাকিস্তান ধ্বংসের আয়োজন করিয়াছে, কথাটা মোটেই সত্য নয়। ‘স্ট্রং সেন্টারের’ নামে আঞ্চলিক শোষণ কায়েম রাখিবার উদ্দেশ্যেই শাসকগোষ্ঠী ও তাঁদের সমর্থক পুঁজিপতিরা এই মিথ্যা জুজুর ভয় দেখাইতেছেন। আসলে আঞ্চলিক শোষণ ও তার পরিণাম সন্দেহ ও অবিশ্বাসের রেষারেষি দূর করিয়া সুখী ও সন্তুষ্ট দুই অঞ্চলের ভিত্তিতে শক্তিশালী পাকিস্তান গড়ারই পন্থা এই ছয়-দফা।
এই পন্থা বাস্তবায়িত করিয়া গোটা পাকিস্তানকে সুখী-শক্তিশালী করিবেন কি না, পশ্চিমা ভাইরা আজ সে বিচারের সম্মুখীন হইয়াছেন। এতদিনের বঞ্চিত পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধি আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় পরিষদের একক মেজরিটি পার্টিরূপে পশ্চিমা ভাইদেরে উদাত্তসুরে বলিতেছেন: ‘আঞ্চলিক শোষণের অবসানে পাকিস্তানকে সুখী-সমৃদ্ধশালী করিবার খাতিরে একদিনের অন্যায়লব্ধ ভুঞ্জিত অধিকার ও ক্ষমতা ত্যাগ করুন শুধু নিজেকে ও নিজের অঞ্চলকে ভালো না বাসিয়া গোটা পাকিস্তানকে ভালো বাসুন।’ এখানেই আজ পশ্চিমা ভাইদের দেশপ্রেমের পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় তাঁরা পাশ করুন। ( শেষাংশ)
লেখকের ‘শেরেবাংলা হইতে বঙ্গবন্ধু’ বই থেকে