আলোকপাত

বঙ্গবন্ধু সরকারের সেবাকেন্দ্র

সমীরন বিশ্বাস

প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল : ১. দারিদ্র্য দূরীকরণ, ২. কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, ৩. মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং ৪. কৃষি উন্নয়ন। যুদ্ধাহত অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিত্সা ও পুনর্বাসনের জন্য ঢাকার আগারগাঁওয়ে সম্পূর্ণ অস্থায়ীভিত্তিতে ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমেরিকান অর্থোপেডিক সার্জন প্রফেসর আর জে গ্রস্টের  নেতৃত্বে একটি সেবাকেন্দ্র স্থাপন করেন। এই সেবাকেন্দ্রে নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্য সেবা পেয়েছেন যুদ্ধাহত অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা। যার কারণে সেবাকেন্দ্রটিকে জনতা ‘মুক্তিবাহিনী হাসপাতাল’ বলে ডাকতেন। সময়ের পরিক্রমায়  যেটি আজ  National Institute of Traumatology and Orthopedic Rehabilitation (NITOR) এই নামে পরিচিত।

একই সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত অনগ্রসর এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সেবার জন্য তত্কালীন সিলেটের সুনামগঞ্জ এলাকায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় সিসিডিবি প্রথম স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু করে। যেটি সময়ের পরিক্রমায় আজ ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স’ নামে অবহিত। পরবর্তীতে সিসিডিবি সারা দেশব্যাপী আরো একটি মেগা প্রকল্প হাতে নেয় যার নাম হলো :Traditional Birth Attendance (TBA). উক্ত প্রকল্পের আওতায় সারা বাংলাদেশে হাজার হাজার ধাতৃমাতাকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়। সেই থেকে এই বঙ্গে ডেলিভারি-কীট ব্যবহার শুরু হয়। যার ফলে মা ও শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। পরবর্তীকালে যা জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃতি লাভ করে। একই সময় ‘কমিউনিটি হেলথ কেয়ার’ নামে আরো একটি মেগা প্রজেক্ট পরিচালিত হয়।

স্বাধীনতা-উত্তর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ এবং কর্মসূচি ছিল ত্রাণ ও পুনর্বাসন। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে উন্নয়ন সহযোগীরা ১৩ মিলিয়ন ডলার তথা ৯,৩৬,০০,০০০ টাকার ত্রাণ ও  পুনর্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, ১৩ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্পটি বঙ্গবন্ধুর হস্তক্ষেপে সিসিডিবির ছাড়পত্র পায়।

বস্তুত উল্লেখিত এলাকায় আপত্কালীন অবস্থায় সিসিডিবি সাহায্য ত্রাণ, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনে সদাতত্পর সেই প্রথম থেকে এবং অদ্যাবধি অগ্রযাত্রীর ভূমিকা পালন করে চলেছে। এই প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজারে জামান ফিশারি নামে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার জন্য জেলেদের উন্নয়নে প্রকল্প গঠন করা হয়। এছাড়া দক্ষিণ অঞ্চলে জেলেদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য সমবায়ের ভিত্তিতে একাধিক আইসপ্ল্যান্ট (বরফ কল) স্থাপন করা হয়। যা আজও বরিশাল, পটুয়াখালি, মানিকগঞ্জে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রকল্পের আওতায় জেলেরা পেয়েছেন শত শত জাল ও নৌকা। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে জানমাল রক্ষার জন্য বঙ্গবন্ধুর প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় রেখে খ্রিষ্টিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ প্রকল্প এলাকায় ৪৭টি সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণ করে। যাতে করে আকস্মিক প্রাকৃতিক ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে মানুষের প্রাণ রক্ষা পায়।

১৯৪৮ সালে সিসিডিসি কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প নামে একটি মেগা প্রকল্প চালু করে। উক্ত প্রকল্পের আওতায় বৃহত্তর বরিশাল ও রাজশাহী অঞ্চলে হাজার হাজার কৃষককে কৃষিতে আধুনিক চাষাবাদ ও প্রযুক্তি প্রদানের লক্ষ্যে সেচপাম্প এবং ট্রাক্টর বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। একই প্রকল্পের আওতায় কৃষিতে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার হিসেবে সোলার পাম্পের ব্যবহার করে কৃষকরা সেচকাজ সম্পন্ন করে। বঙ্গবন্ধুর পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী খাদ্যশস্য উত্পাদনের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বাংলাদেশ আজও আধুনিক কৃষি এবং প্রযুক্তি সম্প্রসারণে প্রাণান্তকর কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।

বঙ্গবন্ধূর আমলে অনগ্রসর আদিবাসী উন্নয়ন প্রকল্প নামে বান্দরবান এবং উত্তরবঙ্গে আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। একই সময় মহিলাদের উন্নয়নের লক্ষ্যে মহিলাদের স্থানীয় সংগঠন তৈরির মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়ন ও তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা হয়।

n লেখক : সমন্বয়কারী, সিসিডিবি, ঢাকা