প্রকৌশলী গাজী নাসিমুর রেজা
উন্নয়নের অনেকগুলো সূচকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হচ্ছে মাথাপিছু বিদ্যুত্শক্তি ব্যবহারের পরিমাপ। যদিও এক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পেছনে পড়ে রয়েছে। উন্নত বিশ্বে যখন মাথাপিছু বিদ্যুত্শক্তি ব্যবহারের পরিমাপ প্রায় ৫ হাজার ৫০০ ইউনিট, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে মাত্র ৩১০ ইউনিট। বিদ্যুত্শক্তি ব্যবহারের পরিমাপ বহুলাংশে নির্ভর করে কলকারখানা ও প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ওপর। অত্যন্ত সুখকর সংবাদ যে বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুতের ঘাটতি নেই, কোনো অভিশপ্ত লোডশেডিংও নেই। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুত্ উত্পাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশের ৯৫ শতাংশ স্থান বিদ্যুতায়নের আওতায় এসেছে, যা চলতি বছরেই শতভাগ হবে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, সরকারকে জনগণের জীবনযাত্রার বিষয় বিবেচনা করে অনেক ক্ষেত্রেই ভর্তুকি প্রদান করতে হচ্ছে, যার একটি সিংহভাগ হচ্ছে বিদ্যুত্ সেক্টর। বর্তমানে আন্তঃসমন্বয়, ঋণদাতাদের চাপ, ভর্তুকি হ্রাস প্রভৃতি কারণে সরকারকে বিদ্যুত্ ব্যবহারের চার্জ বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, যার কারণে জনমনে অসন্তোষ পরিলক্ষিত হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, যে কোনো ভর্তুকি উন্নয়নের অন্তরায়। আয়-ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনা করে অন্ততপক্ষে ৬০০ ইউনিট পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি না করলে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী একটু স্বস্তি পাবে। বিলাসিতার জন্য ভর্তুকি নয়, প্রয়োজনীয়তার জন্য ভর্তুকি। জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুত্ ব্যবহার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু জ্বালানি সে তুলনায় বৃদ্ধি পাচ্ছে না। জ্বালানি অফুরন্ত নয়, যার জন্য ‘রিনিউবেল এনার্জি’র (Renewable Energy) ওপর উন্নত বিশ্ব বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে।
সর্বক্ষেত্রে বিদ্যুত্সাশ্রয়ী বাতি ব্যবহার করে আলোর ক্ষেত্রে ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ বিদ্যুতের সাশ্রয় ঘটেছে। তবে অপ্রয়োজনীয়ভাবে করিডর, সিঁড়ি, বারান্দা, বাথরুম প্রভৃতি স্থানে সার্বক্ষণিক বাতি জ্বালিয়ে রেখে বিদ্যুত্শক্তির অপচয় ঘটছে। এক্ষেত্রে ‘প্যাসিভ ইনফ্রা রেডস্’ ( PIR’s) সুইচ অথবা সেন্সরযুক্ত সুইচ ব্যবহার করে (অর্থাত্, মুভমেন্ট থাকলেই বাতি জ্বলবে) এবং ‘লুমেন্স সেন্সর বা লাক্স লেভেল সেন্সর সংযুক্ত ডিমার’ ব্যবহার করে প্রচুর বিদ্যুত্ সাশ্রয়ের সুযোগ এখনো রয়েছে। টাস্ক লাইটিং ব্যবহার করেও বিদ্যুতের সাশ্রয় করা যেতে পারে, যা উন্নত বিশ্বে ব্যাপক ব্যবহূত হচ্ছে। বর্তমান বাজারে ‘এনার্জি এফিসিয়েন্ট ফ্যান’ পাওয়া যাচ্ছে, যা মাত্র ২৮-৩২ ওয়াট, যেখানে বর্তমানে ব্যবহূত সাধারণ পাখা ৭৫-৮০ ওয়াট। এক্ষেত্রে বিদ্যুত্ সাশ্রয়ের এক যুগান্তকারী সুযোগ রয়েছে। ইনভার্টারযুক্ত এয়ারকুলার, ফ্রিজ, মোটর প্রভৃতি ব্যবহার করে এক্ষেত্রে প্রায় ৩০ শতাংশ বিদ্যুত্শক্তির অপচয় হ্রাস করা যেতে পারে। জানালায় সাধারণ গ্লাসের পরিবর্তে ‘লো-ইমিটিং’ গ্লাস এবং কক্ষসমূহে ‘ইনসুলেশন’ যথাযথভাবে প্রয়োগ করলে এক্ষেত্রে ৩৮ শতাংশ বিদ্যুত্শক্তির অপচয় রোধ কার সম্ভব।
জমি যখন সীমিত, আকাশ তখন উন্মুক্ত। বর্তমানে সুউচ্চ ভবনের কোনো বিকল্প নেই, যার জন্য লিফট অপরিহার্য এবং গাণিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১০ বছরের পুরোনো প্রযুক্তির চেয়ে আধুনিক প্রযুক্তির লিফট প্রায় ৫০-৭০ শতাংশ বিদ্যুত্সাশ্রয়ী। উপরন্তু লিফটের সেন্সরনিয়ন্ত্রিত পাখা ও বাতি বিদ্যুতের সাশ্রয় ঘটায়। লিফটের মেশিনরুমে অপ্রয়োজনীয়ভাবে, অর্থাত্ নির্ধারিত তাপমাত্রার নিচে এয়ারকুলার চালিয়ে বিদ্যুত্শক্তির অপচয় ঘটে থাকে। একই ভবনে একাধিক স্থাপিত লিফট ডুপ্লেক্স বা গ্রুপ কন্ট্রোলের মাধ্যমে সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে বিদ্যুত্ সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের জলবায়ুর পেক্ষাপটে বর্তমানে এয়ারকুলার বিলাসিতা নয়, বরং এটি একটি প্রয়োজনীয় যন্ত্র। নগরজীবনে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসবদ্ধ প্রকোষ্ঠে এয়ারকুলার জীবনযাত্রা ও কর্মপরিবেশের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু প্রযুক্তির এই চরম উন্নতির যুগে এখনো নান্দনিক সুউচ্চ ভবনের দেওয়াল জুড়ে আউটডোর ইউনিট দেখলে আশ্চর্যই হতে হয়। কারণ ৫০ টনের বেশি চাহিদা ভবনে এয়ারকুলার প্লান্ট (water cooled / Air cooled Chilled water A.C plant) স্থাপনের বিকল্প নাই। শুধু গুণগত ও স্বাস্থ্যসম্মত শীতল বাতাসই নয়, পে-ব্যাক, বিদ্যুত্সাশ্রয়ী বিবেচনায় সুউচ্চ ভবনে অতিসত্বর প্ল্যান্ট স্থাপন করা অপরিহার্য। প্ল্যান্টে যখন প্রতি টনে মাত্র শূন্য দশমিক ৬০ কিলোওয়াট। সেই ক্ষেত্রে স্প্লিট বা উইন্ডো টাইপের প্রায় ১ দশমিক ৪০ কিলোওয়াটের প্রয়োজন হয়। একটি আধুনিক ভবনের বিদ্যুত্শক্তির প্রায় ৭০ শতাংশই প্রয়োজন হয় এয়ারকুলারের জন্য, যার জন্য এক্ষেত্রে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুত্ সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে। অনেকের মধ্যে সেন্ট্রাল এয়ারকন্ডিশনার নিয়ে সংশয় রয়েছে। মনে করেন যে ভবনের সমস্ত অংশ এয়ারকন্ডিশনের আওতাভুক্ত, কিন্তু বাস্তবে তা নয়। যেসব প্রয়োজনীয় স্থান আওতাভুক্ত করতে আগ্রহী, শুধু তা করা। প্রাথমিকভাবে ব্যয় অধিকতর হলে সামগ্রিক মূল্যায়নে আর্থিক সাশ্রয়ী ও স্বাস্থ্যসম্মত।
পানি সরবরাহ ও বিদ্যুত্শক্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িত । বিদ্যুত্ ছাড়া পানি উত্তোলন, সরবরাহ, পরিশুদ্ধকরণ এবং সবশেষ ভবনের ছাদে উত্তোলন, অর্থাত্ সর্বক্ষেত্রেই বিদ্যুত্শক্তির প্রয়োজন হয়। পানির অধিকাংশই গৃহস্থালি ও কলকারখানায় ব্যবহূত হয়। গোসল, দাঁত ব্রাশ, শেভ করা, টয়লেটে প্রভৃতি কাজে বিরামহীনভাবে পানির ট্যাপ চালু রাখে প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী। অনেকে অপচয় পছন্দ না করলেও কারিগরি কারণে অর্থাত্ বল-ভাল্ভ বা গ্লোভ ভাল্ভ থাকায় অপচয় হয়েই যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান পর্যায়ে সেন্সরযুক্ত ভাল্ভ ব্যবহার না করা গেলেও লিভার ভাল্ভ ব্যবহার করলেও অনেক পানির অপচয় রোধ করা সম্ভব। বাংলাদেশের সুউচ্চ শতভাগ ভবনের ছাদে সম্পূর্ণ পানি উত্তোলন করতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রচুর বিদ্যুত্শক্তির প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে চাহিদা মাফিক একাধিক ধাপে পানি উত্তোলন করা হলে বিদ্যুতের সাশ্রয় ঘটতে পারে। ইতিপূর্বে এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা শহরে দৈনিক ২ কোটি লিটার পানি ওয়াসা সরবরাহ করে থাকে। এক্ষেত্রে কারিগরি উত্কর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক সচেনতা বৃদ্ধি করা হলে নিশ্চিতভাবে ৩০ শতাংশ পানির অপচয় রোধ করা সম্ভব, যার ফলে অন্ততপক্ষে ১৫০-২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্শক্তি সাশ্রয় করা সম্ভব। আবার হোটেল, রেস্তোরাঁসহ সর্বত্র গরম পানির প্রয়োজন হয়, যা বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে সোলার হিটার ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুত্শক্তির চাহিদা হ্রাস করা যেতে পারে।
বর্তমানে সুউচ্চ ভবনে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার ছাড়া বৈদ্যুতিক সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে না, যার জন্য প্রত্যেক ভবনে ট্রান্সফরমার স্থাপন করতে হয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অনেক সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ভবনসমূহে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার ওভার ডিজাইনের, অর্থাত্ অনেক ক্ষেত্রে চাহিদার তুলনায় ৫০-৭০ শতাংশ অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে থাকে। অধিক হওয়ার কারণে নো-লোড হিসেবে প্রচুর বিদ্যুত্শক্তির অপচয় হয়, যা জাতীয় পর্যায়ে অপ্রয়োজনীয় অপচয়। আবার পুরোনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিতে অধিক বিদ্যুত্শক্তির প্রয়োজন হয়।
বর্তমানে সরকারি পর্যায়েও অফিস স্পেস ব্যবহারের বিধিবিধান অনেকাংশে মানা হচ্ছে না। স্পেস ব্যবহারের সঙ্গে বিদ্যুত্শক্তির প্রয়োজনীয়তা ওতপ্রোতভাবে জরিত। লক্ষ করা যায়, একজন মধ্যম শ্রেণির কর্মকর্তা প্রায় ৩ কিলোওয়াট বা তার বেশি বিদ্যুত্ ব্যবহার করছেন। স্পেস বিধি অনুযায়ী শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক শূন্য কিলোওয়াট প্রয়োজন হতে পারে। আর উন্নত বিশ্বের মতো ওয়ার্ক স্টেশন করা হলে অধিকতর বিদ্যুত্ সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার সঙ্গে বিদ্যুত্ সাশ্রয়ের সম্পর্কটা জড়িত। এক্ষেত্রে সচেতন হলে বিদ্যুতের প্রচুর সাশ্রয় ঘটানো সম্ভব।
বর্তমান বাজার নকল মালে সয়লাব। নকল ও নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সামগ্রী একদিকে যেমন বিদ্যুত্শক্তির অপচয় ঘটায়, অন্যদিকে জান-মালের জন্যও বিপজ্জনক। স্থানীয় বাজারে বহুল ব্যবহূত এলইডি বাতি অধিকাংশই নিম্নমানের, যার জন্য নিয়মানুযায়ী বা হিসাব অনুযায়ী চাহিত বিদ্যুত্শক্তির সাশ্রয় হচ্ছে না।
বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটানোর জন্য বিদ্যুতের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পাবে। এক্ষেত্রে বিদ্যুত্ উত্পাদনের সঙ্গে সঙ্গে জনগণের সচেনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। জনগণ বর্তমানে একটু সচেতন হলে, অর্থাত্ পানির অপচয় রোধ, এনার্জি সেভিং বাতি এবং বিদ্যুত্সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হলে, মনমানসিকতার পরিবর্তন করে উন্নত বিশ্বের মতো ওয়ার্ক স্টেশন ব্যবহার, নিম্নমানের ও নকল বিদ্যুত্সামগ্রী পরিহার এবং অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জাকরণে বিদ্যুত্ সাশ্রয়ের বিষয়টি বিবেচনা করা হলে কোনো কাজে বিঘ্নিত না ঘটিয়ে কোনো কাজ বা উদ্দেশ্যে বিঘ্ন না ঘটিয়ে বর্তমানে প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ সাশ্রয় করা সম্ভব, যার ফলে নিজে এবং জাতি সামগ্রিকভাবে উন্নতি লাভ করবে।
n লেখক :তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী,
গণপূর্ত অধিদপ্তর