শফিকুল ইসলাম
বাংলাদেশের সঙ্গে যে নামটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, তিনি হলেন স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একটি মানুষ কীভাবে ৭ কোটি মানুষের সব আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু ও মহানায়কে পরিণত হতে পারেন, তার দৃষ্টান্ত বাঙালি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান। আকাশচুম্বী ছিল যার জনপ্রিয়তা, যার জ্বালাময়ী ভাষণে দেশের মানুষের রক্তে জেগে উঠত প্রবল উন্মাদনা, যার একটি ভাষণে প্রতিফলিত হয়েছিল দেশবাসীর দীর্ঘদিন ধরে লালিত স্বপ্ন। তার দেখানো পথে, তার হাত ধরেই এসেছিল সেই স্বপ্নের সম্পূর্ণতা আলোকস্নাত মুক্তি—‘স্বাধীনতা’।
স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পর তরুণেরা মুজিবকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, রাজনৈতিক আদর্শকে কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখবে, কীভাবে এক ব্যক্তিই রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন সেগুলো বুঝতে হলে তার শৈশব, কৈশোর, যুবক বয়সে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের যে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব তার ভূমিকা এবং স্বাধীনতার পর একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রের পুনর্গঠনে তার নেতৃত্বকে বুঝতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ছিল এক সম্মোহনী শক্তি, ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ক্যারিশমা। তিনি তার নেতৃত্বের জাদুস্পর্শে ঘুমন্ত বাঙালিদের জাগিয়ে তুলে উদ্দীপ্ত করেছিলেন স্বাধীনতার মন্ত্রে। ‘নিউজ উইক’ ম্যাগাজিন তাকে রাজনীতির কবি (Poet of Politics) হিসেবে আখ্যায়িত করে মন্তব্য করেছে, ‘মুজিব মৌলিক চিন্তার অধিকারী বলে ভান করেন না।’ তিনি ছিলেন শোষিতের পক্ষে। তার রাজনীতির অবলম্বন ছিল বাংলার কৃষক, মজুর। এজন্য তিনি বলেছেন, ‘বিশ্ব দুই শিবিরে বিভক্ত—শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’ বঙ্গবন্ধু কেন এবং কীভাবে ক্যারিশম্যাটিক নেতা হয়ে উঠেছিলেন, সেটাই হবে এই আলোচনার মুখ্য বিষয়। স্কুলজীবন থেকেই ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী। তিনি যখন গোপালগঞ্জ স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়েন, তখন গোপালগঞ্জে এক জনসভার আয়োজন করা হয়েছিল। সভায় বক্তা ছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। কিন্তু গোপালগঞ্জের এসডিও কোনোভাবেই সভা করতে দেবেন না। প্রতিবাদ জানালেন কিশোর মুজিব। তিনি বললেন, ‘জনগণ সোহরাওয়ার্দী, ফজলুল হকের কথা শুনতে চায়, আপনি বাধা দেবার কে?’ সাত দিনের জেল হলো কিশোর মুজিবের।
উপনিবেশী আমলে ঔপনিবেশিকতাবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে মুজিবের রাজনৈতিক দর্শন। মুজিব ছিলেন খাঁটি, নির্ভেজাল স্বদেশপ্রেমী। যে স্বদেশপ্রেমের জন্যই প্রথম যৌবনে পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগের মাধ্যমে কিন্তু এই প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান নামের অদ্ভুত রাষ্ট্রটিতে সেই আশার প্রতিফলন ঘটেনি। পাকিস্তানকে ঘিরে বাঙালির যে স্বপ্ন ছিল, ঐ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তা আদৌ পূরণ হয়নি। বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেড়েছিলেন, কেবল ধর্মের মিল থাকলেই পাখির বিস্তৃত ডানাসদৃশ পাকিস্তানে বাঙালির স্বার্থ সংরক্ষিত হবে না। কারণ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জলবায়ু, সমাজকাঠামো, উত্পাদনব্যবস্থা, জনগণের ভাষা-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যাভ্যাস—কোনো কিছুতেই মিল ছিল না।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে ২৪ বছর ধরেই বাঙালি জাতির সার্বিক মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধু দিনের পর দিন নিরলস আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। শোষক পাকিস্তান রাষ্ট্রে প্রথম ভাঙন তৈরি হয় ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’-এ বিক্ষোভে যারা গ্রেপ্তার হন, বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই ভাষা আন্দোলনের প্রথম কারাবন্দিদের মধ্যে একজন।
১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ৬ দফা, স্বায়ত্তশাসনের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে তিনি শত-সহস্রবার উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘আমরা আমাদের অধিকার চাই—রাজনৈতিক অধিকার, সামাজিক মর্যাদা, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি এবং অর্থনৈতিক সমতা। শুধু মুখের ভাষা প্রকাশের অধিকারই নয়, একটা গোটা জাতিকে তিনি সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য থেকে মুক্ত করতে সংগ্রাম করেছেন দীর্ঘদিন।
সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল গড়ে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তার ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো বলেছেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতায় তিনিই হিমালয়।’ বঙ্গবন্ধু রাজনীতিকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের অগ্রপথিক। জাতির এই মহানায়কের আদর্শ, নেতৃত্ব, দেশপ্রেম, বাঙালি হূদয়ে চিরঅম্লান হয়ে থাকবে। বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়