আবির হোসেন
কদিন আগে একটা ঘটনা ঘটেছে কুড়িগ্রামে। এটাকে কী তুঘলকি কাণ্ড বলবো নাকি যত্সামান্য সাধারণ কিছু, এই প্রশ্ন্ন অনেকক্ষণ ধরে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ডিসি সুলতানা পারভীনের নির্দেশে একজন সাংবাদিককে রাতেরবেলায় তার ঘরের দরজা ভেঙে মারতে মারতে তুলে নিয়ে গেছেন এডিসি নিজামউদ্দিন। মাদকের যে নাটক সাজিয়েছে সেটা নাটকের খুব পুরোনো রীতি,মানুষ আর বিশ্বাস করে না। এই যে সাধারণ মানুষের অবিশ্বাস, তা কি কোনো জাদুমন্ত্রে হয়েছে? না। ক্রমান্বয়ে ক্ষয় হতে হতে এই বিশ্বাস হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো চুপসে গেছে। পুরো না হলেও অন্তত মোটামুটিভাবে আমরা জানি সমাজের কোন্ পর্যায়ের কি হালচাল। যারা এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বিষয় বলবে এরাও অসুস্থতার অন্য মঞ্চে আছে সেটাও আমরা জানি। সাংবাদিক পরিচয় বাদই দিলাম, ধরে নিলাম একটা সাধারণ মানুষ। একজন মানুষকে মধ্যরাতে তার ঘরের দরজা ভেঙে তার নিজের বাচ্চাদের সামনে পেটাচ্ছেন এডিসি। তারপর গাড়িতে তুলে চোখ, হাত বেঁধে ফেললেন। এবার প্রজাতন্ত্রের একজন মালিককে গুলি করে হত্যা করবেন বলে কালেমা পড়ে নিতে বলছেন। তারপরের দৃশ্য হলো আরিফুলকে ধরে জেলার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক স্থান ডিসির অফিসে নিয়ে যাওয়া হলো। বিবস্ত্র করে দেওয়া হলো এবং তার ভিডিও ধারণ করে রাখা হলো। তারপর আবারও পেটানো হলো।
ওপরের প্যারার সবগুলো লাইনের শেষেই বোধহয় আশ্চর্যবোধক চিহ্ন (!) ব্যবহার করা দরকার ছিল। অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় বোধহয় তা করলাম না। যাই হোক, ভাবছি এককালে তো পৌরনীতিতে ‘আমলাতন্ত্রের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য’ পড়েছি। এবার এটাকে বোধহয় লাল ফিতা বলা যাবে না। এটা আমলাতন্ত্রের লাল ক্ষমতা, লাল যন্ত্র, লাল অস্ত্র, লাল অবিচার। সবচেয়ে বড়ো কথা, এই আমলারা গোটাই লাল মানুষ। এসব ভেবে যখন স্থির হই তখনই আবার হঠাত্ মনে হয়—না, এটা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। কুড়িগ্রামের ডিসি, এডিসিরা ভাইসরয় বা জমিদার। আরিফুল খাজনা পরিশোধে হেরফের করায় জমিদারের খড়গ নেমে এসেছে। এসব শেষে বিবস্ত্র করার কথা মনে পড়লে আবার সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে যাই, ভাবি এটা তাহলে মধ্যযুগ। কিন্তু মধ্যযুগে ভিডিও ক্যামেরা আসলো কোথা থেকে! তাহলে এটা বোধহয় মধ্যযুগ আর আধুনিক যুগ মিশিয়ে নতুন বর্বরতা,নতুন কায়দা। এসবই ভাবছি।
একটা বিষয় খেয়াল করলে দেখা যায় বিভিন্ন সনদপত্রের বিচারে ব্যক্তি হিসেবে শিক্ষাগত যোগ্যতায় এরা কেউই অযোগ্য না। নাজিমউদ্দিন উচ্চশিক্ষিত, দেশের একটা নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। কিন্তু জোরালো প্রশ্ন রয়ে যায় যে কি শিখলো? কি শিখালো? এতো এতো আক্ষেপের পরও স্রোতের বিপরীতে উজান ভেদ করে তরি বাইছেন অনেকে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে মাহাবুব কবীররা আছেন, র্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট সরোয়ার আলমরা আছেন, পুলিশে আছেন হাবিবুর রহমান। গোয়ালন্দ থানার ওসি আশিকুর রহমান, দুদকে বানসুরি এফ ইউসুফদের হাত আমাদের শক্তি যোগায়। নাম না জানা আরো অনেক অনেক আমলা আছেন যারা আমাদের আশার প্রদীপের জ্বলন্ত শিখা।
আমরা যেন ভুলে না যাই লাখ লাখ প্রাণের বিনিময়ে এটি একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ। আমরা যেন ভুলে না যাই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বারংবার বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদেরই লোক’। আমরা যারা পর্বতসম এই মানুষটিকে ‘আমাদেরই লোক’ বলে মনে করি, সেই মহান মানুষটির স্বপ্নের সোনার বাংলা এবং আমাদের প াপ্য অধিকারকে আমরা কখনোই ভূপাতিত এবং বিপর্যস্ত হতে দিব না। আলো আসবেই।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ, ঢাকা