দেশে আরো তিন জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। ইতালিফেরত এক ব্যক্তির পরিবারের তিন সদস্যের মধ্যে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ায় বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ জন। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ আইইডিসিআরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানিয়ে বলেন, নতুন আক্রান্ত তিন জনের মধ্যে এক জন নারী, বয়স ২২ বছর। আর দুই জন পুরুষ; একজনের বয়স ৬৫, অন্যজনের ৩২। নতুন আক্রান্ত তিনজনই স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত হয়েছেন এবং একই পরিবারের সদস্য। তারা ইতালিফেরত পরিবারের এক জনের সংস্পর্শে এসেছিলেন। তবে আক্রান্ত ওই তরুণীর মধ্যে উপসর্গ খুবই মৃদু। বাকি দুই জনের জ্বর রয়েছে, তাদের হাসপাতালে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া অন্য কোনো সমস্যা তাদের নেই।
প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত করোনা আক্রান্তদের মধ্যে প্রথম দফার তিন জন ইতিমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন; হাসপাতালে ভর্তি আছেন ১৩ জন। আর এক জন মারা গেছেন। করোনা ভাইরাস বিষয়ে যোগাযোগ করতে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) নতুন আরো একটি হটলাইন, ই-মেইল ও ফেসবুক পেজ চালু করেছে। মহাপরিচালক বলেন, আমাদের বেশ কয়েকটি হটলাইন নম্বর রয়েছে। আইইডিসিআরের ১৭টি। কিন্তু এই নম্বরগুলোয় আইভিআর যুক্ত না থাকায় অনেকেরই যোগাযোগ করতে অসুবিধা হচ্ছিল। সেজন্য করোনা বিষয়ে আইইডিসিআরের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে ই-মেইল ও ফেসবুকের মাধ্যমে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন উপনির্বাচন আপাতত বন্ধ রাখারও পরামর্শ দেন তিনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানান, দেশে এখন মোট ১৯ জনকে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। আর প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে আছেন ৪৩ জন।
ইজতেমা মাঠে হবে চিকিত্সা
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, বাংলাদেশে ৫ হাজারেরও বেশি মানুষকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। তাদেরকে করোনা সন্দেহে পরীক্ষা করা হয়েছে। দুয়েক দিনের মধ্যে ফলাফল পাওয়া যাবে। গতকাল বিকালে সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে তিনি আরো বলেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে যে ১৭ জন করোনায় আক্রান্ত বলে চিহ্নিত হয়েছেন, তাদের বেশির ভাগের বাড়ি মাদারীপুর ও ফরিদপুর জেলায়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় দেশের স্বাস্থ?্য বিভাগের সবার ছুটি বাতিল করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ছুটি বাতিলের আদেশ বহাল থাকবে। তিনি আরো বলেন, দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী যাদের পাওয়া যাবে, তাদের টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে রেখে চিকিত্সা দেওয়া হবে। আর সেখানকার সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে সেনাবাহিনী। বর্তমানে ইজতেমা মাঠে দুই হাজার মানুষকে চিকিত্সা দেওয়ার মতো ব্যবস্থা রয়েছে। প্রয়োজনে ইজতেমা মাঠেই আরো বড়ো পরিসরে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিত্সার ব্যবস্থা করা হবে। আমরা এর জন্য প্রস্তুত রয়েছি। এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে তুরাগতীরের ওই মাঠ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বিদেশে যারা অবস্থান করছে তাদের এই মুহূর্তে দেশে না আসার পরামর্শ দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে কোনো ধরনের পর্যটন চলবে না। ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান শিথিল করার জন্য অনুরোধ করছি। আপতত বিয়ের অনুষ্ঠানও বন্ধ করা হোক। বাস, লঞ্চ ও ট্রেনেও যেন কম যাত্রী আসা-যাওয়া করে, সে অনুরোধ করা হচ্ছে। যাদের জ্বর রয়েছে, তারা কোথাও আসা-যাওয়া করবেন না। এ সংকট মোকাবিলায় সব মন্ত্রণালয় একসঙ্গে কাজ করছে।
এদিকে করোনা ভাইরাস মোকাবেলার ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমাবন্দর। প্রবাসীরা দলে দলে ফিরছেন। প্রবাসীদের দেশে ফেরা ঠেকাতে পারছে না সরকার। হযরত শাহাজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক তৌহিদ-উল আহসান জানান, এখনো প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৭ হাজার মানুষ এই বিমানবন্দরে নামছেন।
এ ব্যাপারে জাহিদ মালেক বলেন, বিদেশ থেকে এসে কোয়ারেন্টাইন না করে অনেকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অনেকে মিথ্যা কথা বলছেন। স্বীকার করছেন না যে তারা বিদেশ থেকে এসেছেন। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের তো বটেই, অন্যদেরও ক্ষতি করছেন। বিদেশে যারা আছেন, তারা দয়া করে আসবেন না। আপনার আপনজনদের ক্ষতি করবেন না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরো বলেন, সব দেশ আমাদের সাহায্য করছে। টেস্টিং কিট দিচ্ছে। আমাদের ১৭টি হটলাইন নম্বর দেওয়া আছে। প্রতিদিন আমাদের অনেক ফোন আসে। সব জেলা থেকে আমরা আপডেট পাচ্ছি। আমরা নির্বাচন কমিশনকে বলেছি মিছিল বন্ধ রাখতে। ক্লাব-সিনেমা হলও বন্ধ করা হয়েছে। জাহিদ মালেক বলেন, আমরা করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় দুই মাস ধরে চেষ্টা করছি। এজন্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশ অনেক ভালো আছে। দেশে আক্রান্তের হার কম, মৃত্যু হয়েছে এক জনের।
শিবচর ‘বিচ্ছিন্ন’
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে ওষুধ, কাঁচামাল ও মুদি দোকান বাদে সব ধরনের দোকানপাট ও গণপরিবহন বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম। এর আগে উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে দুই ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা সভার আয়োজন করে শিবচর উপজেলা প্রশাসন। সভায় জানানো হয়, উপজেলার বাজারগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান ব্যতীত সব দোকান বন্ধ থাকবে। সব ধরনের গণজমায়েত, বিয়ে, মাহফিল, রাজনৈতিক সমাবেশ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান বন্ধ থাকবে এবং সব ধরনের গণপরিবহন, নসিমন, করিমনসহ যান চলাচল বন্ধ থাকবে। ইউএনও আসাদুজ্জামান বলেন, ‘শিবচর উপজেলায় সদ্য বিদেশ থেকে অন্তত ৬৬৪ জন মানুষ এসেছে। এদের প্রত্যেককেই ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বাধ্য করতে হবে।’
কিট তৈরির কাঁচামাল আমদানির অনুমতি
এদিকে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস শনাক্ত করার জন্য গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র যে কিট তৈরি করেছে, তা উত্পাদনের অনুমতি দিয়েছে সরকার। গতকাল গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, কিছুক্ষণ আগে আমরা সরকারের কাছ থেকে এ কিট তৈরির অনুমোদন পেয়েছি। এর কাঁচামাল যুক্তরাজ্য থেকে আসতে সাত দিনের মতো সময় লাগবে। কাঁচামাল এলেই আমরা উত্পাদনে যাব। এর আগে বুধবার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র এ কিট তৈরির ঘোষণা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি থেকে দাবি করা হয়, স্বল্পমূল্যের ঐ কিট দিয়ে মাত্র ১৫ মিনিটে করোনা শনাক্ত করা সম্ভব। ঐ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন ড. বিজন কুমার শীল।
কোয়ারেন্টাইনে থাকাদের হাতে মারা হবে সিল
বিদেশ প্রত্যাগত নাগরিকদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহে কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে এসব কমিটি গঠন করতে হবে। বুধবার এ সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করা হয়। এ লক্ষ্যে গঠিত কমিটিকে সহায়তা করার জন্য সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ করা হয়। এদিকে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকারি নির্দেশে হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন ৫ হাজার প্রবাসী। কিন্তু সরকারি এ নির্দেশনা মানছেন না অনেক প্রবাসী। বুঝে কিংবা না বুঝেই অনেকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বাইরে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করেও তাদের ঘরে রাখা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনাপ্রাপ্ত প্রবাসীদের চিহ্নিত করতে তাদের হাতে অমোচনীয় কালির সিল দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এর আগে করোনার উপসর্গ থাকা ব্যক্তিদের হোম কোয়ারেন্টাইন থেকে পালানো ঠেকাতে তাদের বাঁ হাতে একটি বিশেষ ‘সিল’ মেরে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে দেখা গেছে ভারতের মহারাষ্ট্রে। অনেকটা সে আদলেই বাংলাদেশেও এটা করা হবে।
জানা গেছে, করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় এবার কঠোর হচ্ছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে বিদেশফেরতদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকাসহ বেশ কিছু নিয়ম মেনে চলতে নির্দেশনা দিয়ে সম্প্রতি গণবিজ্ঞপ্তিও জারি করা হয়েছে। নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তি হিসেবে জরিমানাও করা হচ্ছে। পুলিশি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। বিদেশফেরতদের ঘরে থাকতে মাদারীপুরে চলছে মাইকিং। একই সঙ্গে পুলিশ টহল দেওয়া হচ্ছে। বিদেশফেরতদের ঘরে থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।