করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধে ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্তের মধ্যেই আগামীকাল শনিবার তিনটি সংসদীয় আসনে উপনির্বাচনে ভোট বহাল রেখেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। যতই ঝুঁকি থাকুক না কেন, কোনোভাবেই ভোট বন্ধ করবে না সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। তিন জন নির্বাচন কমিশনার ভোট পেছানোর পক্ষে থাকলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। কমিশনের মতো নানা মহলে ইসির এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা চলছে। ভোট বহালের এই সিদ্ধান্তে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ঢাকা-১০, গাইবান্ধা-৩ এবং বাগেরহাট-৪ আসনের ভোটাররা। তারা বলছেন, ভোটারদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় না নিয়ে এই ধরনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত মহাসংকটে ফেলবে। সরকার যেখানে সব ধরনের অনুষ্ঠান বন্ধ করেছে সেখানে ভোটের কোনো প্রয়োজন ছিল না।
গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিশ্বে ২ লাখ ২৫ হাজারের ওপরে মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। নিহত ১০ হাজারের কাছাকাছি। দেশে ১৭ জন আক্রান্ত, নিহত ১ জন। অথচ বিকালে নির্বাচন কমিশনাররা বৈঠক করেও নির্বাচন করার পক্ষে মত দিয়েছে। এ নিয়ে ইসির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ দেখা গেছে। নির্বাচনের সব প্রস্তুতি শেষ হওয়ায় তিন সংসদীয় আসনে নির্বাচন নিয়ে আগের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে ইসি। তবে চট্টগ্রাম সিটি (চসিক) নির্বাচন এবং যশোর-৬ ও বগুড়া-১ আসনের উপনির্বাচনের বিষয়ে আগামী ২১ মার্চ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। নির্বাচন বিশ্লেষকরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলছেন, নির্বাচনের নামে বর্তমান কমিশন তামাশা শুরু করেছে। ভোটারদের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ নেই কমিশনের। নিজেদের একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে বরাবরই অভ্যস্ত তারা। সংবিধানেই ভোট পেছানোর সাংবিধানিক ক্ষমতা দেওয়া আছে ইসির। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদেই বলা আছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মতে, কোনো দৈব-দুর্বিপাকের কারণে এই দফায় নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে উক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব না হয়, তাহলে উক্ত মেয়াদের পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে উক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল অনুষ্ঠেয় তিনটি সংসদীয় আসনে ভোটার রয়েছেন ১০ লাখ ১৭ হাজার । আর ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা রয়েছেন প্রায় ৭ হাজার। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য থাকবেন ২০ হাজারের ওপরে। একইদিন নির্বাচনি আসনগুলোতে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াত করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার বড়ো হুমকি বলে মনে করছেন ইসির একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। নাম গোপন রাখার শর্তে তারা বলেন, করোনা ভাইরাস সংক্রমনের ভয়ে অনেক ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে অনীহা প্রকাশ করছেন। তাদেরকে আইনের ভয় দেখিয়ে দায়িত্ব পালনে বাধ্য করা হচ্ছে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, গতকাল ঢাকা-১০, গাইবান্ধা-৩ ও বাগেরহাট-৪ আসনে উপনির্বাচন নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসে কমিশন। ঐ বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, কবিতা খানম এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী ভোট পেছানোর পক্ষে মত দিলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম শনিবার ভোট বহালের পক্ষে ছিলেন। সংবিধান অনুযায়ী ভোট পেছানোর একক ক্ষমতা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি)। ফলে সিইসির সিদ্ধান্তই বৈঠকে চূড়ান্ত হয়।
বৈঠক শেষে কমিশন সভার সিদ্ধান্ত সাংবাদিকদের জানান ইসির সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর। এ সময় তিনি বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হন। কমিশনের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে মো. আলমগীর বলেন, করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি বাংলাদেশে পাওয়া গেছে। কিন্তু যেহেতু এখনো মহামারি আকারে ছড়ায়নি এবং ভোটের মাত্র একটি দিন সামনে আছে সেজন্য এ নির্বাচনে (২১ মার্চের) ভোটগ্রহণ করাটাই অধিকতর যুক্তিসংগত বলে মনে করেছে ইসি। তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রে হ্যান্ড স্যানিটাইজার থাকবে। ভোটাররা হাত ধুয়ে ভোট দেবে, আবার ভোট দেওয়ার পর হাত ধুয়ে বের হয়ে আসবে। তিনি আরো বলেন, আইন অনুযায়ী ভোটার উপস্থিতি কম হলে কিছু হয় না। যিনি (যে প্রার্থী) ভোট বেশি পাবেন তিনি নির্বাচিত হবেন।
ভোটকেন্দ্রে আসা নাগরিকদের থেকে অন্যের মধ্যে এ ভাইরাস ছড়ালে ইসি দায় নেবে কী না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আশা করি দায় নিতে হবে না। যেহেতু আপনারা বলছেন টার্নআউট কম হবে। সুতরাং সেই ভয় নেই। তিনি বলেন, গণতন্ত্রে বলছে যদি একটা ভোট পড়ে সেটাও নির্বাচন। যেহেতু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আছে তাই নির্বাচন করতে হবে। চট্টগ্রাম সিটির ভোটের বিষয়ে তিনি বলেন, আগামী ২১ মার্চ কমিশনের নির্ধারিত বৈঠক হবে। সেখানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন ও দুটি আসনে স্থগিত হবে নাকি ভোট হবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত সেবা বন্ধ ঃ কমিশন সভায় আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত সেবা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।