দেশে নতুন তিন জনসহ মোট আক্রান্ত ২০

বাংলাদেশে আরো তিন জনের মধ্যে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে, যাদের মধ্যে সত্তরোর্ধ্ব এক জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আইসিইউতে তার চিকিত্সা চলছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা গতকাল শুক্রবার আইইডিসিআরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানিয়ে বলেন, নতুন তিন জনকে নিয়ে বাংলাদেশে আক্রান্তের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন কারো মৃত্যুর তথ্য আসেনি; এ পর্যন্ত বাংলাদেশে এক জনেরই মৃত্যু হয়েছে।

ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, নতুন আক্রান্ত তিন জনের মধ্যে এক জন নারী, তার বয়স ৩০ বছরের নিচে। তার কাশি আছে। বাকি দুই জন পুরুষের মধ্যে এক জনের বয়স ৩০ বছর, অন্যজনের ৭০ এর বেশি। সত্তরোর্ধ্ব ঐ ব্যক্তি ‘ক্রিটিক্যাল কনডিশনে’ আছেন। তার অন্যান্য স্বাস্থ্য জটিলতা আছে। নাসিমা সুলতানা বলেন, আক্রান্ত ত্রিশোর্ধ্ব পুরুষ রোগী ইতালি ও জার্মানি ঘুরে এসেছেন। আর বাকি দুই জন সংক্রমিত হয়েছেন অন্যদের মাধ্যমে। তাদের মধ্যে ঐ নারী ইতালিফেরত এক জনের সংস্পর্শে এসেছিলেন। নতুন আক্রান্ত তিন জন আলাদা পরিবারের। এখন পর্যন্ত আইসোলেশনে ৩০ জন, প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে ৪৪ জন রয়েছেন।

শিবচরের ৪ এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা

মাদারীপুরের শিবচরের চারটি এলাকায় করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ঐ চার এলাকায় বাইরে থেকে কোনো মানুষকে প্রবেশ ও এলাকা থেকে কারো বের হওয়া পুরোপুরি বন্ধ করেছে প্রশাসন। শুক্রবার বিকালে জরুরি সভার পর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় ইতালি প্রবাসীদের উপস্থিতি বেড়ে যাওয়ায় করোনা ভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে উপজেলার দুইটি ওয়ার্ড ও দুইটি গ্রামকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ নজরদারিতে রয়েছে ঐ চার এলাকা। এগুলো হলো— শিবচর পৌরসভার দুইটি ওয়ার্ড, পাঁচ্চর ইউনিয়নের একটি গ্রাম ও দক্ষিণ বহেরাতলা ইউনিয়নের একটি গ্রাম। এ সকল এলাকার মানুষদের চলাচল সীমিত করা হয়েছে। এছাড়া উপজেলার কিছু এরিয়া ভিত্তিক দোকানপাট আংশিক বন্ধ রাখা হয়েছে।

শিবচর থানায় প্রেস ব্রিফিংয়ে ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নুরে আলম মিনা বলেন, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে মাদারীপুর জেলার শিবচরের চারটি এলাকা বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এসব এলাকার প্রবেশ ও বহির্গমন নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে ঐ চারটি এলাকার বাসা-বাড়িতে কোনো দ্রব্যসামগ্রীর জন্য ফোন করলে তা পৌঁছে দেওয়ারও ব্যবস্থা করা হবে। তিনি আরো বলেন, করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে এখানকার সব পুলিশের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। প্রায় ২৫০ জন অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হচ্ছে।

জানা গেছে, জনগণের স্বার্থে বিদেশফেরতদের হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখতে কঠোর প্রশাসন। প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের না হতে স্থানীয়দের প্রতি অনুরোধ জানানো হচ্ছে। এমন অবস্থায়ও ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন প্রবাসীরা। মাদারীপুর জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, শিবচর উপজেলায় প্রবাসী রয়েছেন প্রায় ৫ হাজার। গত ১৫ দিনে ইতালিসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৬০০ প্রবাসী শিবচরে ফিরেছেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের কঠোর নির্দেশনা থাকলেও বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রবাসীরা হোম কোয়ারেন্টাইন মানছেন না। প্রকাশ্যে তারা চলাফেরা করছেন। সচেতন মহল তাদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার পরামর্শ দিলে উলটো তাদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

আইইডিসিআরে দীর্ঘ লাইন

এদিকে আইইডিসিআরে করোনা শনাক্তকরণের জন্য দীর্ঘ লাইন পড়ে গেছে। এতে সেবা প্রত্যাশীদের ভোগান্তি বাড়ছে। করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত চিহ্নিত করে তাকে আত্মীয়স্বজনসহ সবার কাছ থেকে আলাদা করা জরুরি হলেও ঢাকার রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) ছাড়া দেশের আর কোথাও এ ভাইরাস শনাক্তকরণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ নেই। এ কারণে বিদেশফেরত ও তাদের স্বজনরা আইইডিসিআরে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন। এছাড়া রাজধানীর বাইরে কারো এ রোগের উপসর্গ দেখা গেলে তাকে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে রক্ত এবং গলা ও নাকের লালা ঢাকায় পাঠিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিত্সা শুরুর ক্ষেত্রে বিলম্ব ঘটার পাশাপাশি নানা ধরনের ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানান, করোনা ভাইরাস শনাক্তকরণ পরীক্ষা পুরান আটটি মেডিক্যাল কলেজ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে করোনোর ব্যবস্থা করতে হবে। নইলে পরিস্থিতি খারাপ হবে। আইইডিসিআরের এক জন কর্মকর্তা জানান, করোনা ভাইরাস শনাক্তকরণ একটি জটিল প্রক্রিয়া এবং কঠোর মানের নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়। দেশের বেশির ভাগ সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভাইরাসটি নির্ণয়ের জন্য প্রশিক্ষিত জনশক্তি এবং প্রযুক্তিগত ক্ষমতা নেই। তবে রাজধানীর বাইরের কোনো হাসপাতালে সন্দেহভাজন কোনো রোগীকে ভর্তি করা হলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ‘আইইডিসিআর’কে রিপোর্ট করবে। এরপর আইইডিসিআর টিম রোগীর কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে ঐ হাসপাতালে যাবেন।

ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, দেশের বাইরে থেকে এসে যারা হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন তাদের জন্য কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ১৪ দিন বাসার একটি কক্ষে অবস্থান করতে হবে। কারো সঙ্গে মিশবেন না। ব্যবহার্য জিনিসপত্র অন্য কারো সঙ্গে মেলানো যাবে না। এসব উপদেশ মেনে চললে এদেশের মানুষ নিরাপদ থাকবে। এগুলো না মানলে সরকার কড়া পদক্ষেপ নেবে। একটি এলাকা এরইমধ্যে লকডাউন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। নাসিমা সুলতানা বলেন, বয়স্ক বা যারা কিডনি, হার্টসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি অসুখে ভুগছেন তাদের বেশি সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে তারা যেন বাইরে না যান। তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম।

অধ্যাপক নাছিমা সুলতানা বলেন, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত স্ক্রিনিং করা হয়েছে মোট ৬ লাখ ৩৮ হাজার ৭৭৪ জনের। গত ২৪ ঘণ্টায় স্ক্রিনিং করা যাত্রীর সংখ্যা ৭ হাজার ২৩৬। ২৪ ঘণ্টায় হটলাইনে কল এসেছে ২ হাজার ৪১৭। তথ্য বাতায়নে ২৯ হাজার ৬২টি কল আসে। সেবা নিয়েছেন ৫০ জন। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এক ব্যক্তিকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হিসাবে শনাক্ত করার গুঞ্জনের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আইইডিসিআরের মেডিক্যাল এন্টোমোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম আলমগীর বলেন, ‘ঐ ব্যক্তি এখানে অন্তর্ভুক্ত নন। ওটা রি-টেস্টিংয়ের প্রয়োজন রয়েছে।’  বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের’ (সামাজিকভাবে এক জন থেকে আরেক জনে ছড়িয়ে পড়া)  কোনো ঘটনা পাওয়া গেছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন বিদেশফেরতদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আক্রান্ত পাচ্ছি আমরা। পরিবারের বাইরে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।’ 

করোনা ভাইরাসের কোনো উপসর্গ দেখা দিলে বা সন্দেহ হলে যোগাযোগের জন্য হটলাইন চালু করেছে আইইডিসিআর। তাতে ফোন করলে বাড়িতে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করবেন আইইডিসিআরের কর্মীরা। হটলাইন নম্বর : ০১৯৪৪৩৩৩২২২। কেউ চাইলে iedcrcovid19@gmail.com ঠিকানায় ইমেইল করে নিজের বক্তব্য জানাতে পারবেন। এছাড়া ফেসবুক গ্রুপ Iedcr,COVID-19 Control Room-এর ইনবক্সে সমস্যার কথা বলতে পারবেন।

বিদেশফেরতদের হাতে কোয়ারেন্টাইনের সিল

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিদেশফেরতদের হাতে কোয়ারেন্টাইন সিল দেওয়া হচ্ছে। এতে তারা কত দিন  হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকেবন তার উল্লেখ রয়েছে। ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ থেকে বলা হয়, বৃহস্পতিবার থেকে তারা এ ব্যবস্থা নিয়েছেন।

জাতীয় প্রেসক্লাব ও ঢাকা চিড়িয়াখানা বন্ধ

সতর্কতামূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এবার জাতীয় প্রেসক্লাব ও ঢাকা চিড়িয়াখানা আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষণা অনুযায়ী, ২১ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত জাতীয় প্রেসক্লাবের সব ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকবে। শুক্রবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের ব্যবস্থাপনা কমিটি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যদিকে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. ইফতেখার হোসেনের পাঠানো এক বার্তায় বলা হয়েছে, করোনা ভাইরাসের বিস্তাররোধে ঢাকার মিরপুরে ঢাকা চিড়িয়াখানা ৩১ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার।

বগুড়ায় বিদেশফেরত ৯৪ ব্যক্তির হদিস নেই

গোয়েন্দা তালিকা অনুযায়ী চলতি মাসে ১৯৯ জন প্রবাসী বিভিন্ন দেশ থেকে বগুড়ায় ফিরেছেন। এর মধ্যে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ১০৩ জনকে বাড়িতে কোয়ারেন্টাইনে রেখেছে। দুই জন শঙ্কামুক্ত। অবশিষ্ট ৯৪ জনের কোনো হদিস নেই। বাড়িতে কোয়ারেন্টাইনে থাকার কথা থাকলেও বিদেশফেরত এসব ব্যক্তির তথ্য নেই স্বাস্থ্য বিভাগেও।

সাতক্ষীরায় ৮ হাজার প্রবাসী কোয়ারেন্টাইনের বাইরে

সাতক্ষীরায় বিভিন্ন দেশ থেকে বাড়ি ফিরেছেন ৮ হাজার ৮৬৮ জন। কিন্তু হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন ১৬৯ জন। এছাড়া সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছেন এক জন। তাদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ এসেছেন ভারত থেকে। জেলা প্রশাসন ও সিভিল সার্জন অফিসে তাদের তালিকা পাঠানো হয়েছে।