বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের আশঙ্কার মধ্যেই আজ শনিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তিনটি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচন। করোনা ভাইরাস আতঙ্কের মধ্যে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্তে চরম সমালোচনার মুখে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আজ শনিবার সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ঢাকা-১০, গাইবান্ধা-৩ ও বাগেরহাট-৪ আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনটি সংসদীয় আসনের মধ্যে আবার ঢাকা-১০ আসনের সব কয়টি কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট হবে। যদিও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাসিমা সুলতান বলেছেন, নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করায় করোনা হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কেননা, ফিঙ্গারপ্রিন্টযুক্ত ইভিএমে ভোটদান থেকে করোনা ছড়ানোর ঝুঁকি আছে।
ইসির সংশ্লিষ্ট ও নির্বাচন বিশ্লেষকেরা বলছেন, করোনা ঝুঁকির মুখে শ্রীলঙ্কা তাদের পার্লামেন্ট ইলেকশন স্থগিত করেছে। অথচ আমরা চরম ঝুঁকি নিয়ে নির্বাচনের দিকে। কমিশনকে অবশ্যই ভোটারদের নিরাপত্তার বিষয়টি সবার আগে বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল। যেহেতু তাদের ভোটারদের নিয়ে কোনো চিন্তা নেই, সেহেতু কমিশনের মূল লক্ষ্য ভোট সম্পন্ন করা। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দৈবদুর্বিপাক মনে করলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ইচ্ছা করলে নির্বাচন তিন মাস পিছিয়ে দিতে পারেন।
যদিও কমিশন ভোটারদের করোনা ভাইরাসের ঝুঁকিমুক্ত রাখতে প্রতিটি কেন্দ্রে করোনা সতর্কীকরণ ব্যানারসহ হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান, টিসু পেপারের ব্যবস্থা রেখে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। একই সঙ্গে ভোটারদের ভোট প্রদান করে দ্রুত কেন্দ্র ত্যাগ করার পরামর্শ দিয়েছেন। হাত ধুয়ে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আজ অনুষ্ঠেয় তিনটি সংসদীয় আসনে ভোটার রয়েছেন প্রায় সাড়ে ১০ লাখ। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা রয়েছেন প্রায় ৭ হাজার। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য থাকবেন ২০ হাজারের ওপরে। একই দিন নির্বাচনি আসনগুলোতে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াত করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার বড়ো হুমকি বলে মনে করছেন ইসির একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
ঢাকা-১০ আসন :ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৪, ১৫, ১৬, ১৭, ১৮ ও ২২ ওয়ার্ড (ধানমন্ডি ও লালবাগ থানা) নিয়ে গঠিত ঢাকা-১০ সংসদীয় আসন। এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ১২ হাজার ২৮১ জন। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১১৭ এবং ভোটকক্ষ ৭৭৬টি। নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছয় জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এরা হলেন আওয়ামী লীগের মো. শফিউল ইসলাম (নৌকা), বিএনপির শেখ রবিউল আলম (ধানের শীষ), জাতীয় পার্টি-জাপার হাজি মো. শাহজাহান (লাঙ্গল), বাংলাদেশ কংগ্রেসের অ্যাডভোকেট মো. মিজানুর রহমান (ডাব), বাংলাদেশ মুসলিম লীগের নবাব খাজা আলী হাসান আসকারী (হারিকেন) ও পিডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী আব্দুর রহিম (বাঘ)।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্লাপুর-পলাশবাড়ী) সংসদীয় আসনের জন্য গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে কর্মকর্তাদের বিতরণ করা হয় ভোটগ্রহণের সরঞ্জাম। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাগণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ অনিরাপদ যাহবাহন ট্রাক্টরযোগে এসব সরঞ্জাম নিয়ে রওনা হয়ে যান নিজ নিজ ভোটকেন্দ্রে। গাইবান্ধা জেলা নির্বাচন ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. মাহাবুবুর রহমান জানান, ২১ মার্চ শনিবার সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। একটি পৌরসভা ও ১৯টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনে ভোটার ৪ লাখ ৩৫ হাজার ২১১ জন এবং ভোটকেন্দ্র ১৩২টি। ভোটগ্রহণের জন্য ১৩২ জন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা, ৭৮৬ জন সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ও ১ হাজার ৫৭২ জন পোলিং কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে।
গাইবান্ধার পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম জানান, সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণের জন্য প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে একজন সহকারী পরিদর্শকসহ পাঁচ জন পুলিশ ও ১২ জন আনসার দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া দুই উপজেলায় ১০ প্লাটুন বর্ডারগার্ড ও প্রয়োজনীয়সংখ্যক র্যাব সদস্যের মোবাইল টিম দায়িত্ব পালন করবে। আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ডা. ইউনুস আলী সরকার ২০১৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর মারা যাওয়ায় এই ভোট হচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট উম্মে কুলসুম স্মৃতি, বিএনপির দলীয় প্রার্থী গাইবান্ধা জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক ও জাপার প্রার্থী মইনুল রাব্বী চৌধুরী। এদিকে গত বুধবার জাসদের প্রার্থী খাদেমুল ইসলাম খুদি নৌকার সমর্থনে তার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন।
বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, বাগেরহাট-৪ (মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা) আসনের উপনির্বাচনে দুটি উপজেলার ১৪৩টি কেন্দ্রে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৫১০ জন ভোটার রয়েছেন। পুলিশ, বিজিবি, র্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এলাকায় এলাকায় টহল দিচ্ছেন। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে নির্বাচনি এলাকার ১৪৩টি ভোটকেন্দ্রে নির্বাচনি সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু করেছে ইসি। এই আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট আমিরুল আলম মিলন এবং জাতীয় পার্টি-জাপার সাজন কুমার মিস্ত্রি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও বাগেরহাট-৪ আসনের রিটার্নিং কর্মকতা মো. ইউনুচ আলী বলেন, ভোট নির্বিঘ্ন করতে ১০ প্লাটুন বিজিবি, দুই প্লাটুন কোস্টগার্ড, র্যাবের ১০টি টহল টিম নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নির্বাচনে ২৩ জন নির্বাহী, দুই জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশের ২১টি ভ্রাম্যমাণ টিম এবং ১০টি স্ট্রাইকিং ফোর্স মাঠে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকবে। ১৪৩টি ভোটকেন্দ্রে স্বচ্ছ ব্যালট ব্যাক্স, সিলসহ সব সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। শান্তিপূর্ণ ভোট উপহার দিতে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে পাঁচ জন পুলিশ সদস্য ও ১২ জন আনসার সদস্য থাকবেন। নির্বিঘ্নে ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে আহ্বান জানান ঐ কর্মকর্তা।
গত ১০ জানুয়ারি বাগেরহাট-৪ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ডা. মোজাম্মেল হোসেনের মৃত্যু হলে আসনটি শূন্য হয়। ৬ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন উপনির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করে। ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী ১৯ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাপার তিন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। বিএনপি দলীয় প্রার্থী কাজী খায়রুজ্জামান ঋণ ও করখেলাপি হওয়ায় তার মনোনয়নপত্রটি বাতিল করে নির্বাচন কমিশন।