এই অনুষ্ঠান জাতির পিতার মর্যাদা রক্ষার উপযোগী হয়েছে কি?

দশ দিগন্তে g আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

আমাদের কথা সাহিত্যের জাদুকর সৈয়দ শামসুল হক তার মৃত্যুর আগে আমার কাছে তার শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘গাফ্ফার, আমার শেষ ইচ্ছা, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর উত্সবটা যেন দেখে যেতে পারি।’ আমাদের এই কথোপকথন মিডিয়ায় বহুলভাবে প্রচারিত হয়েছে। সৈয়দ হকের এই ইচ্ছা পূরণ হয়নি। তিনি এই জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান হওয়ার বেশ আগেই মারা গেছেন। আমার সৌভাগ্য, সৈয়দ হকের সমবয়সী  হয়েও এখনো বেঁচে আছি এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মোত্সবের দুই ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠানটি সুদূর লন্ডনে বসেও সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেছি।

প্রথমে মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ইচ্ছা ছিল, মার্চ মাসে ঢাকায় উপস্থিত থেকে এই অনুষ্ঠানে যাব। টুঙ্গিপাড়ায় যাব জাতির জনকের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। কিন্তু কপাল মন্দ, করোনা ভাইরাসের এই বিশ্বব্যাপী অভিযানের ফলে লন্ডন থেকে ঢাকায় যাওয়ার প্লেনের টিকিটের ব্যবস্থা করেও যেতে পারিনি। ব্রিটিশ ন্যাশনাল হেলথসার্ভিসের কড়া নির্দেশ সত্তর বছর বয়সের বেশি লোকদের অন্তত চার মাস গৃহে অবস্থান করতে হবে। অর্থাত্ চার মাস গৃহবন্দি। আমার বয়স আশির ওপরে। সুতরাং মনোবাসনা পূর্ণ করার সুযোগ পেলাম না। এরপর আরো একশ বছর পর যখন বঙ্গবন্ধুর দ্বিশতজন্মবার্ষিকী পালিত হবে তখন কবরে আমার অস্তিত্ব টিকে থাকবে না। ফলে এ বছর ঢাকায় উপস্থিত হয়ে জাতির পিতার এই জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারলাম না—এটা আমার জীবনের পরম দুর্ভাগ্য। তবে করোনা ভাইরাস শুধু আমাদের অনেকের নয়, দেশে ও বিদেশে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর উত্সবের আনন্দকেও অনেকটা ক্ষুণ্ন করেছে। ঢাকায় উত্সব পালনের কর্মসূচি অনেকটা ছাঁটকাট করা হয়েছে। হাজার হাজার নর-নারীকে টেলিভিশন অথবা সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢাকার অনুষ্ঠান দেখতে হয়েছে। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আমিও সোশ্যাল মিডিয়ায় অনুষ্ঠানটি দেখেছি। দেখেছেন আমার চার বন্ধু। তাদের মধ্যে দুজন ভারতীয় সাংবাদিক বন্ধু। একজন পশ্চিমবঙ্গের। স্পেনিশ বন্ধুটি কেমব্রিজের ভাষা-সাহিত্যের অধ্যাপক। চতুর্থ জন লন্ডনের প্রাচীনতম থিয়েটার ওল্ডডিকের সঙ্গে যুক্ত একজন নাট্যশিল্পী। এরা বাংলাদেশ সম্পর্কে খুবই আগ্রহী। কথা ছিল আমরা একসঙ্গে বসে অনুষ্ঠানটি দেখব। কিন্তু করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ বিস্তার ঘটায় সকলকেই ঘরে থাকার নির্দেশ দেওয়ায় আমাদের এই ইচ্ছাটি পূর্ণ হয়নি। আমি একা ঘরে বসে অনুষ্ঠানটি দেখেছি। তারাও সেভাবেই দেখেছেন। পরে আমরা অনুষ্ঠানটি নিয়ে মতবিনিময় করেছি। মতবিনিময় করেছি লন্ডন ও ঢাকার আরো অনেকের সঙ্গে। দেখলাম, অনুষ্ঠানটি আমার মতো অনেকেরই আশাভঙ্গের কারণ হয়েছে।

আমারও অনুষ্ঠানটি দেখে মনে হয়, এই অনুষ্ঠান দেখার জন্য এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে দেশে না গিয়ে ভালোই করেছি। ঘরে বসে দিনটিতে জাতির পিতা, আমাদের অনেকের মুজিব ভাইকে অন্তরের শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছি, সেটাই ভালো হয়েছে। প্রথমেই স্পেনীয় বন্ধুর কমেন্ট জানাই। তিনি বলেন, ‘একজন সাধারণ নেতার জন্মোত্সব পালনে যে সাধারণ অনুষ্ঠান হয়, এই অনুষ্ঠান তার দুর্বল অনুকরণ। একজন মহানায়কের জীবন ও কর্ম তুলে ধরার ব্যাপারে অভিজ্ঞান ও মৌলিক চিন্তার কোনো চিহ্ন নেই এই অনুষ্ঠানে।’

পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক বন্ধু বললেন, আমার মন্তব্য আপনার কানে একটু কঠোর লাগবে। ১৭ মার্চের অনুষ্ঠানকে কলকাতায় আমাদের মেয়রের জন্মদিনের অনুষ্ঠানের চাইতে উন্নত মনে হয়নি। আচ্ছা আপনাদের দেশে কি কোনো সুরকার নেই, যিনি এই অনুষ্ঠানের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক তৈরি করতে পারতেন? পশ্চিমবঙ্গের এক সুরকারের ‘শোনো একটি মুজিবরের কণ্ঠে’ গানটির সুর বারে বারে বাজাতে হলো কেন?

ভারতের আরেক সাংবাদিক বললেন, ‘আমি যতদূর জানি, বঙ্গবন্ধু শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি দার্শনিক না হলেও জাতিকে একটি দর্শন দিয়ে গেছেন। তিনি অর্থনীতিবিদ না হয়েও দেশকে একটি সুষম অর্থনীতির রূপরেখা দিয়ে গেছেন। সবচাইতে বড়ো কথা, তিনি একটি জাতিসত্তাকে তার হাজার বছরের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যসহ পুনরুদ্ধার করে গেছেন। অনুষ্ঠানের নাচে গানে তার পরিচয় কই? তার যে সৃষ্টিশীল জীবন, যে জীবন বাংলার হাজার বছরের লোকজ ঐতিহ্য দ্বারা গঠিত, তার পরিচয় কই এ অনুষ্ঠানে? এই অনুষ্ঠান তো যে কোনো একজন রাজনৈতিক নেতার জন্মদিনের অনুষ্ঠান হতে পারত। কেবল মুজিব নামটা মুছে দিলেই হতো। ওল্ডডিকের নাট্যশিল্পী বললেন, ‘আকরম খানের ট্রুপের অনুষ্ঠান এবং কয়েকটি নাচ তার ভালো লেগেছে। কিন্তু গোটা অনুষ্ঠানে শেখ মুজিবের নাম ছাড়া তার উপস্থিতি তিনি টের পাননি।

এই অনুষ্ঠানটি দেখে আমার মনে হয়েছে, এটি না দেখলে আমার কোনো ক্ষতি ছিল না। এটা না দেখে সারাদিন শুধু যদি বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী এবং তার কারাগারের রোজনামচা পাঠ করতাম, তার রেকর্ডকৃত ভাষণ শুনতাম তাহলে ভালো করতাম। আমার এক বন্ধু ঠিকই বলেছেন, এটা একজন সাধারণ রাজনৈতিক নেতার সাধারণ জন্মদিনের অনুষ্ঠান। এটা গতানুগতিক, এটা ইমিটেশন, কোনো ইমাজিনেসন বা নিজস্ব চিন্তাভাবনার কোনো ছাপ নেই। বাংলার আকাশ, বাতাস, নদী ও পাখির গানের কোনো ছাপ তাতে লাগেনি। লাগেনি বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের কোনো ছাপ। যে লোকজ ঐতিহ্যের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর জন্ম ও বেড়ে ওঠা।

আমার মনে আছে, মাত্র ২৯ কি ৩০ বছর বয়সে বঙ্গবন্ধু বরিশালে গিয়েছিলেন, গিয়ে প্রথমেই খোঁজ নিয়েছিলেন, স্বদেশি যুগের চারণ কবি মুকুন্দ দাসের বাড়ি বরিশাল শহর থেকে কতদূরে? যখন জানলেন সাত-আট মাইল দূরে, তখনই যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন। মুকুন্দ দাস বিদেশি শাসনবিরোধী স্বদেশি যাত্রার প্রবর্তন করেছিলেন। সেই স্বদেশি যাত্রা আরো মাসখানেক পরে অনুষ্ঠিত হবে জেনে বঙ্গবন্ধু দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। আমার তো ততদিন বরিশালে থাকা হবে না।

মুজিব নামের এই মানুষটিকে আমি বড়ো বেশি চিনি। খুব কাছে থেকে জানি। তাকে দেখলেই আমার মনে হতো ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের সঙ্গে ১৯৬৯ সালে রাজশাহীতে  গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন শহর থেকে ২০ মাইল দূরে সাঁওতালপল্লিতে। তিনি সাঁওতাল-জীবন নিয়ে ছবি আঁকছিলেন। এই সময় ছয়দফার পক্ষে স্লোগান দিয়ে একটি ছাত্রমিছিল যাচ্ছিল। জয়নুল আবেদীন তা দেখে আমাকে বলেছিলেন, “আমি ‘বাংলার মুখ’ নামে একটি ছবি আঁকতে চাই। এই বাংলার মুখ শেখ মুজিব। তাকে দেখলেই আমার মনে হয়, তিনি মানুষ নন, একটি বিশাল দেশ। সে দেশটি বাংলাদেশ। বাংলার জারিসারি পুঁথিপাঠ, যাত্রা, মঙ্গলকাব্য, চর্যাপদ থেকে আউল-বাউল সবকিছু যেন এই মানুষটির মধ্যে মিশে আছে।” তার এ কথার প্রতিধ্বনি পাওয়া গিয়েছিল সিরিল ডান নামে এক বিখ্যাত সাংবাদিকের লেখনিতে। তিনি ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হতেই লিখেছিলেন, ‘শেখ মুজিবই বাংলাদেশের একমাত্র নেতা, যিনি দেহের রঙে, গঠনে, ভাষায়, নৃতাত্ত্বিকভাবে এমন এক নেতা, যিনি সার্বিকভাবেই একজন বাঙালি।’ সিরিল ডানের এই কথাটি শতভাগ সত্য। শেখ মুজিব নামের মানুষটি শুধু বাঙালির রাজনৈতিক অধিকারের জন্য লড়াই করেননি, তিনি বাঙালির হাজার বছরের ভাষা ও সভ্যতা রক্ষার জন্য লড়াই করেছেন।

জন্মশতাব্দী বার বার আসে না। বঙ্গবন্ধুর জন্মদ্বিশতবার্ষিকী আবার পালন করা হবে। একশ বছর পরে। তখন আমি বা আমার প্রজন্মের কেউ বেঁচে থাকব না। তাই আশা-উদ্বেল বুকে—এই জন্মশত বার্ষিকীর অনুষ্ঠানটির জন্য প্রতীক্ষা করছিলাম। আশা করছিলাম, তাকে শাশ্বত কালের শাশ্বত মহানায়কের সম্মান দিয়ে তার যোগ্য মর্যাদার অনুষ্ঠান হবে। তাতে তার বঙ্গবন্ধু থেকে বিশ্ববন্ধু হওয়ার চরিত্রটির উদ্ভাসন হবে। এ ধরনের অনুষ্ঠান করার জন্য বিদেশ থেকে কারিগর ডাকার দরকার নেই। আমাদের দেশেই আছেন এমন মেধা ও প্রতিভার অধিকারী মানুষ, যারা দল ও পরিবারের সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ একজন মহামানবের চরিত্রের প্রতিভাস ঘটে এমন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারেন।

তাদের অনেকের নাম দেখেছি, এই জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন কমিটিতে। তাহলে ১৭ মার্চের এই বহু প্রতীক্ষিত অনুষ্ঠানটি দেখে আমার কবি ওয়ার্সওয়ার্থের ‘ইয়ারো রিভিজিটেডের’ অবস্থা হলো কেন? অনুষ্ঠানটির এই দৈন্যদশা কেন? কমিটির বেশ কয়েকজন সদস্যকেই কারণটা জিজ্ঞাসা করেছি। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্ত দিয়ে বললেন, “আমরা এই কমিটিতে ছিলাম নামের খসম আজিজ মেছেরের মতো। কমিটিতে সদস্য হিসেবে আমাদের নাম দেখেছি। কিন্তু কমিটির আমলা-সেক্রেটারি কোনোদিন আমাদের কোনো বৈঠকে ডাকেননি, পরামর্শ চাননি। নিজের খুশিমতো সবকিছু করেছেন। কিন্তু এখন সব দায় নিতে হচ্ছে আমাদের। অনেকেই জিজ্ঞাসা করছেন, এমন মহান নায়কের জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান এত দায়সারা গোছের হলো কেন? শুনেছি, এই অনুষ্ঠানের জন্য অর্থবরাদ্দ কম ছিল না।

ঢাকার এক নন্দিত শিল্পী, যিনি উদ্যাপন কমিটিতে ছিলেন, তাকে অনুষ্ঠানটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেই বললেন, আমাকে আর লজ্জা দেবেন না। আমি ভারতে রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকী, জন্মসার্ধ্বশতবর্ষের অনুষ্ঠানও দেখেছি। তারপর এক ইতিহাস স্রষ্টার জন্মশতবর্ষের এমন অনুষ্ঠান দেখব তা ভাবিনি। এই অনুষ্ঠানে আমলা-সেক্রেটারি প্রথমেই নিজের গান ঢুকিয়েছেন। সাড়ম্বরে নিজের নামও গীতিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি একজন ভালো কবি। কিন্তু তার লিরিক অত্যন্ত দুর্বল। মিউজিকের গুণে কোনো রকমে উের গেছে। বাংলাদেশে এখন ভালো গীতিকার, সুরকারের অভাব নেই। কেন, তাদের কাউকে দিয়ে এই মহান দিবসটির উপযোগী গান লেখানো যেত না? ক্ষমতা হাতে বলে নিজেকেই গীতিকার হতে হবে?

আমি নিজেও ছিলাম এই উদ্যাপন কমিটির একজন সদস্য। কিন্তু এই অনুষ্ঠানটি দেখার আগ পর্যন্ত এ সম্পর্কে কিছুই জানিনা। আমাকে কিছুই জানানো হয়নি। তাতে আমার দুঃখ হতো না। যদি অনুষ্ঠানটি জাতীয় অথবা আন্তর্জাতিক মানসম্মত হতো। অনেক গুণী এবং আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত শিল্পী এই অনুষ্ঠানে ছিলেন। কিন্তু তাদের কলের পুতুলের মতো ব্যবহার করা হয়েছে। তারা তাদের উন্নতমানের শিল্প-সৌকর্য প্রদর্শন করতে পারেননি। অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ও পরিচালনায় অদক্ষতার ফলে যে কজন শীর্ষস্থানীয় শিল্পী যোগ দিয়েছেন, তাদের কুশলতাও ম্লান হয়ে গেছে। আগেই লিখেছি, কলকাতার একটি গানের সুর বারবার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এটি ‘শোনো একটি মুজিবরের কণ্ঠে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠ’—গানটির সুর। খুবই জনপ্রিয় গান ও সুর। তাই বলে বার বার সেটি বাজাতে হবে কেন? বাংলাদেশে কি ভালো সুরকারের অভাব আছে, যাদের নিয়ে বৈচিত্র্যময় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক তৈরি করানো যেত না? অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে রামেন্দু মজুমদার ও ডা. নুজহাত আলিম মান বজায় রেখেছেন। কিন্তু পর্দার আড়ালের কণ্ঠস্বরটি ধারা বর্ণনায় ছিল একেবারেই প্রাণহীন। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল এটা এককালের বাঘা আবৃত্তিশিল্পী (এবং অভিনেতাও) আসাদুজ্জামান নূরের। কয়েক বছরের মন্ত্রিত্ব অথবা মন্ত্রিত্ব হারানো কি তার অমন অসাধারণ প্রতিভা গ্রাস করে ফেলেছে?

সমবেত কণ্ঠের গানে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানা যোগ দেয়ায় আমার খুব ভালো লেগেছে। কিন্তু তার কবিতাটি কবিতা হয়নি। কিছু উচ্ছ্বাসপূর্ণ কথা মাত্র। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে এই কবিতাটি অনুষ্ঠানে  আবৃত্তি করায় এটার মর্যাদা বেড়েছে। কিন্তু এই কবিতার বদলে রেহানা যদি পিতা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি নিয়ে নিজের কিছু কথা বলতেন, তা অনুষ্ঠানটির মান আরো বাড়াত।

এককালে রাষ্ট্রপতি ও বিচারপতিরা ছিলেন সকল সমালোচনার ঊর্ধ্বে। এখন আর তা নয়। তারা সমালোচনার আওতার মধ্যে এসেছেন। তবু আমাদের রাষ্ট্রপতির কোনো সমালোচনা করতে চাই না। কেবল বিনীতভাবে তাকে একটা কথা জানাতে চাই। মোহাম্মদ আবদুল হামিদ এখন মহামান্য রাষ্ট্রপতি। তিনি যখন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ছিলেন, তখন থেকেই তার সঙ্গে আমার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। নিউইয়র্কে এক সময় আমরা একই হোটেলে একই সঙ্গে ছিলাম। সেই ঘনিষ্ঠতা ও পরিচয়ের সূত্রেই তাকে এই কথা কটি বলছি, তিনি যেন আমার অপরাধ না নেন।

সব দেশেই রাষ্ট্রপতির ভাষণ লিখে দেন তার প্রেস বিভাগের কর্মকর্তারা। রাষ্ট্রপতি সেটা পাঠ করেন। কিন্তু কোনো কোনো রাষ্ট্রপতি নিজের ভাষণ নিজেই লেখেন, যেমন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ। তিনি নিজের ভাষণ নিজেই লিখতেন। একবার গান্ধী জন্মজয়ন্ত্রীতে তার মুদ্রিত ভাষণ পাঠের সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। অসাধারণ ভাষণ। চিরকাল মনে রাখার মতো। আমাদের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ড. রাধাকৃষ্ণণের মতো পণ্ডিত অথবা দার্শনিক না হতে পারেন, কিন্তু তিনি একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক। সায়ল্লইকার চরিত্রের আভিজাত্য। এ জন্যই বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে তার কাছ থেকে রাষ্ট্রপতি পদের মর্যাদা সমুন্নত রাখার মতো একটি ভাষণ আশা করেছিলাম। কিন্তু তার ভাষণটি আমার কাছে মনে হয়েছে, আওয়ামী লীগের সভাপতির ভাষণ। তিনি যে ভাষণ দিয়েছেন তা একটি আনুষ্ঠানিক  ভাষণ হয়েছে। জন্মশতবার্ষিকীর উপযোগী ভাষণ হয়েছে কি?

[ লন্ডন, ২১ মার্চ, শনিবার ২০২০ ]