‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’

বাংলা প্রবাদবাক্যে আছে, ‘গোদের উপর বিষফোড়া’। ইহার সহজ ব্যাখ্যা হইল, বিপদের উপর বিপদ। সমার্থক আরেকটি প্রবাদ বাক্য হইল ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। অর্থাত্ কষ্টের উপর কষ্ট। আবার কথায় বলে, ‘বিপদ যখন আসে, তখন চারিদিক দিয়াই আসে’। এই সকল কথার বাস্তব প্রতিফলন আমরা বর্তমানে লক্ষ করিতেছি। সারা বিশ্ব আজ কাঁপিতেছে করোনা-জ্বরে। উন্নত বিশ্বও এই ভাইরাস মোকাবিলায় হিমশিম খাইতেছে। প্রতিদিন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িতেছে। বাংলাদেশেও এই ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। সরকারি উদ্যোগে কোয়ারেন্টাইন বা আইসোলেশন ক্যাম্প তৈরির উদ্যোগ পরিলক্ষিত হইতেছে। লকডাউন ও হোম কোয়ারেন্টাইনের সংখ্যাও নিশ্চিতভাবে বাড়িতে থাকিবে। এই উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠার মধ্যে নূতন কোনো রোগের উপদ্রবের কথা বলাটা কঠিন হইলেও সচেতনতার দিক হইতে বিষয়টি অনুপেক্ষণীয়।

খবরে প্রকাশ, এই বত্সর আবারও আমাদের দেশে কোথাও কোথাও বাড়িতে শুরু করিয়াছে এডিস মশার উপদ্রব। গত শনিবার পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াইয়াছে ২৬৬। এডিস মশাকে পরিচিত করিয়া দিবার তেমন কোনো প্রয়োজন নাই। গত কয়েক বত্সর ধরিয়া ‘ডেঙ্গু’ শব্দটি আমাদের নিকট অতি পরিচিত। এডিস মশা হইল সেই ডেঙ্গু রোগের বাহক। ইহাতে আমাদের দেশে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটিয়াছে। কিন্তু তাহা বলিয়া ইহাতে খুব বেশি বিচলিত হইবার কোনো কারণ নাই। কেননা, ডেঙ্গু কীভাবে মোকাবিলা করিতে হয়, সেই ব্যাপারে এখন আমরা অনেকটাই অভিজ্ঞ। প্রয়োজন কেবল আবারও সতর্ক হইয়া চলা। এমনকি আমরা যদি সর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকি, এডিস মশা যেখানে বংশ বিস্তার করে, সেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাই এবং স্প্রে করিয়া মশার বংশ ধ্বংস করি, তাহা হইলে পরিচ্ছন্নতার এই সচেতনতায় আমরা করোনা ভাইরাসও প্রতিরোধ করিতে পারি। করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সবচাইতে জরুরি আগে নিজে পরিষ্কার থাকা, ঘন ঘন হাত জীবাণুমুক্ত করা, মাস্ক পরিধান করা ইত্যাদি। আর ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজন আমাদের বাড়িঘর ও আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, যাহাতে সেখানে এডিস মশা বংশ বিস্তার করিতে না পারে। সাধারণত বর্ষা মৌসুমে নির্মাণাধীন ভবনের ছাদে, জমাইয়া রাখা পানিতে, ফুলের টবে, বাসাবাড়ির বালতিতে জমিয়া থাকা পানিতে, এমনকি ফ্রিজ-এসি হইতে জমিয়া থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশার প্রজনন বৃদ্ধি পায়। শুধু এডিস নহে, এই সময়ে কিউলেক্স মশার উপদ্রবও বৃদ্ধি পায়। সুতরাং স্থানীয় সরকারের উচিত এই ব্যাপারে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

রাজধানীর উত্তরা, বিমানবন্দর, পুরানা পল্টন, যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁও, সায়েদাবাদ, ডেমরা, লালবাগ, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, গুলশানসহ বিভিন্ন স্থানে মশার বিস্তার ঘটিতেছে। কীটতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা রাজধানীতে অনুসন্ধান চালাইয়া এই সকল এলাকায় মশার উপস্থিতি ও লার্ভা পাইয়াছেন। ইহাতে বুঝা যায়, আমরা নিজেদের এখনো পুরাপুরি বদলাইতে পারি নাই। এখনো আমাদের বাড়ির আঙিনা ও আশপাশের পরিবেশ অপরিষ্কার, যাহা অপ্রত্যাশিত। অনেক বাড়ির পার্শ্বে নিজস্ব পুকুর বা জলাশয় থাকে। এই সকল স্থান আমাদের নিজস্ব উদ্যোগেই পরিষ্কার করিতে হইবে। উন্নত দেশে নিজ বাড়ি ও আশপাশের এলাকা অপরিষ্কার রাখিলে জরিমানারও বিধান রহিয়াছে। তাই সতর্কতা ও সচেতনতাই হইতে পারে এই ক্ষেত্রে বড়ো দাওয়াই।