নতুন করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ বিস্তারের মুখে গণমাধ্যমে প্রকাশের জন্য লেখা এক নিবন্ধে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘আমি শুধু সময়ের দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি। প্রতি মুহূর্তে যেন আমরা সুযোগ হারিয়ে ফেলছি। এখনো বিষয়টা বুঝে উঠতে পারলে আমাদের সামনে যে রকমের যুদ্ধ আমরা সে রকমের প্রস্তুতি নিতে পারতাম। যুদ্ধটার চেহারাটা যেন আমরা কেউ দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারছি না। চেহারাটা পরিষ্কার বুঝতে পারলে সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম যে—জীবনের ওপরেই যখন হামলা, জীবনবাজি রেখেই এখন লড়াইতে নামব। আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ এখানে নেই।’ তিনি লিখেছেন, ‘করোনা ভাইরাসের বিস্তারের গতি দেখলে যে কোনো মানুষ থ হয়ে যাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেইজিং অফিসকে চীন একটা অজানা রোগের কথা জানিয়েছিল গত ডিসেম্বরের ৩১ তারিখে। আজ মার্চের ২২ তারিখ। অর্থাত্ ৮২ দিন আগে। এই ৮২ দিনে কিন্তু এই রোগ সারা দুনিয়া তছনছ করে ফেলল। তার মোকাবিলার জন্য এখন সেনাবাহিনী তলব করতে হচ্ছে। সমস্ত কিছু অচল করে মানুষকে ঘরের ভেতর দিনরাত কাটাতে বাধ্য করা হচ্ছে। সরকার তার মোকাবিলার জন্য ট্রিলিয়নকে ট্রিলিয়ন ডলার বরাদ্দের ঘোষণা দিচ্ছে। সরকারপ্রধানরা সারাক্ষণ টেলিভিশনের সামনে এসে মানুষকে প্রতিটি পদক্ষেপ ব্যাখ্যা করছে। পার্লামেন্টে সব দল একমত হয়ে আইন পাশ করছে। দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করছে। সারা দুনিয়া ক্রিকেটের স্কোর বোর্ডের মতো করোনার স্কোর বোর্ড দেখছে। অতীতে কোনো বিশ্বযুদ্ধও মানুষকে এত ভাবিয়ে তুলতে পারেনি। অথচ মাত্র ৮২ দিনের ব্যাপার। সে যে দেশেই ঢুকছে সে দেশকেই নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছে।’
‘আমাদের কপাল ভালো এই ৮২ দিনের মহামূল্যবান অভিজ্ঞতা আমরা অন্য দেশগুলোর কাছ থেকে পেয়ে গেছি। এই অভিজ্ঞতা যদি আমরা কাজে না লাগাই তাহলে আমরা আমাদের কপালকে দুষতে পারব না। দুষতে হবে আমাদের নির্বুদ্ধিতাকে, বালিতে আমাদের মাথা গুঁজে রাখাকে।’
একটা দেশে ঢোকার পরপর সে কত শতাংশ মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয় সেটা জার্মানির চ্যান্সেলরের ভাষণ থেকেই বুঝা যায় স্পষ্টভাবে। জার্মানির মানুষ যখন করোনার চেহারার সঙ্গে পরিচিত হতে পারেনি, এমন এক সময়ে চ্যান্সেলর মার্কেল জাতিকে জানালেন যে এই রোগ শিগগিরই ৭০ শতাংশ জার্মান নাগরিকের মধ্যে সংক্রমিত হবে। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর তার ভাষণে বলেছেন, আগামী দুই মাসে ক্যালিফোর্নিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা আড়াই কোটিতে পৌঁছবে।
তার গতিপথ পালটানোর কোনো ব্যবস্থা এখনো কেউ করতে পারেনি। আমাদের লড়াই হবে তার গতিপথ থেকে নিজেকে আড়াল করা। যারা যত সফলভাবে তা করতে পারবে তারা তত আঘাত কমাতে পারবে। সবচেয়ে সফলভাবে কাজটা করতে পেরেছে এশিয়ারই কয়েকটি দেশ। চীন এ কাজ পেরেছে। তারপর সফল হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান, হংকং ও সিঙ্গাপুর। সফল দেশগুলোর কৌশল ছিল একটাই। যে যখনই আক্রান্ত হচ্ছে তাকে চিহ্নিত করো। তাকে আলাদা জায়গায় রাখো। তাহলে সংক্রমণ থেকে অন্যরা রেহাই পাবে। সংক্রমণ থামাতে পারলেই রোগের বিস্তার হতে পারবে না। এক জন থেকে দুই জনও যদি সংক্রমিত হয় তাহলে হুহু করে সংখ্যা বেড়ে যায়। একটা পরিসংখ্যান দিচ্ছি : একজন যদি প্রতি পাঁচ দিনে ২.৫ জনকে আক্রান্ত করে তাহলে ৩০ দিনে সে একাই ৪০৬ জনকে আক্রান্ত করবে। যারা এ কাজে গাফিলতি করে ভীষণ বিপদে পড়েছে, তারা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সুইজারল্যান্ড। এখন তাদের অবস্থা সামালের বাইরে।
জোয়ার ঠেকাতে হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে পরীক্ষা, পরীক্ষা, পরীক্ষা। যত জনকে পরীক্ষা করার সামর্থ্য আমাদের আছে তত জনকে পরীক্ষা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, পরীক্ষা ও চিহ্নিত করো এবং আলাদা করো। এই মুহূর্তে যদি জাতি সমস্ত সরকারি, বেসরকারি, সামাজিক, আন্তর্জাতিক শক্তি নিয়ে এগিয়ে না আসে, কোনো বিবেচনায় বিলম্ব করে, তাহলে এই রোগের বিপুল প্লাবনকে বাঁধ দিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে পারব না। জোয়ারের ঠেলায় সবকিছু ভেসে যাবে।’ তিনি লিখেছেন, ‘অবশ্যই মহাপ্লাবন আসছে। প্রায় দ্বারপ্রান্তে। আমরা বরং দেরি করে ফেলছি। আর দেরি করার সুযোগ নেই। অল্প সময়ের মধ্যে সবকিছু আমাদের নির্ধারণ করতে হবে। কোনোভাবেই সময় কিন্তু খুব বেশি আমাদের হাতে নেই।’