করোনার চিকিত্সায় বাজার থেকে ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাওয়া

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারিতে শুধু মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে তাই নয়, উদ্বিগ্ন মানুষ ছুটছে কেনাকাটা, খাবার-দাবার মজুতের পিছনে। পাশাপাশি বাজারে তৈরি হচ্ছে ওষুধের তীব্র সংকট। করোনা ভাইরাসের চিকিত্সায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন কার্যকর বলার পর বিশ্বের অন্য স্থানের মতো বাংলাদেশেও এই ওষুধটি নিমিষেই হাওয়া হয়ে গেছে। দেশের অন্যতম ওষুধ কোম্পানি ইনসেপ্টা এই ওষুধটি তৈরি করে। এছাড়া  ক্লোরোকুইন নামে দেশের আরো দুই-একটা কোম্পানি ওষুধ তৈরি করলেও এসব ওষুধও মার্কেট থেকে হাওয়া হয়ে গেছে। এই জাতীয় ওষুধের মূল্য প্রতি প্যাকেট ৩৬০ টাকা। অথচ ওষুধের দোকানে এসব ওষুধ যদি কোথাও থেকে থাকে তা প্রতি বক্স বিক্রয় হচ্ছে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকায়। তবে উত্পাদক কোম্পানি ইনসেপ্টার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মুকতাদির জানান, আতঙ্কিত হবার কিছু নেই। এই ওষুধের পর্যাপ্ত মজুত আছে। তবে সমস্যা হচ্ছে ওষুধের দোকানে এ জাতীয় ওষুধ সরবরাহের সঙ্গে সঙ্গে উদ্বিগ্ন মানুষ এটা কিনে নিচ্ছে। ফলে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, এক জন ফার্মাসিস্ট হিসাবে বলতে পারি করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে (প্রফাইল্যাক্সিস) এই ওষুধের কোনো কার্যকারিতা নেই। শুধু পিসিআর পরীক্ষার মাধ্যমে কারো শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হলে চিকিত্সকের পরামর্শে কেবল উক্ত রোগীই এই ওষুধটি সেবন করতে পারবেন। মূলত ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন নামের এই যুগান্তকারী ওষুধটি ম্যালেরিয়া চিকিত্সায় ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ)  হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের ম্যালেরিয়া চিকিত্সার জন্য অনুমোদন দেয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প করোনা আক্রান্তদের হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন সেবনের পক্ষে মত দিলেও এফডিএ বলেছে তারা এখনো এই ওষুধটি করোনা আক্রান্তদের চিকিত্সায় অনুমোদন দেয়নি। তবে এফডিএ বলেছে ওষুধটি ট্রায়ালে আছে। তারা করোনা চিকিত্সায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের কার্যকারিতা নিয়ে আশাবাদী বলে মন্তব্য করা হয়।

এদিকে করোনা ভাইরাসের প্রতিরোধ সম্পর্কে প্রখ্যাত চিকিত্সক অধ্যাপক এ বি এম আব্দুল্লাহ জানান, সুস্পষ্টভাবে মনে রাখা দরকার করোনা ভাইরাস ওষুধের মাধ্যমে প্রতিরোধ করার কোনো ব্যবস্থা নেই। অর্থাত্ করোনা ভাইরাসের কোনো ধরনের প্রফাইল্যাক্সিস নেই। তিনি গুজবে কান না দিয়ে অথবা হুজুগে করোনা চিকিত্সার জন্য কোনো ওষুধ না কেনার পরামর্শ দেন। কেবল সঠিক পরীক্ষার মাধ্যমে কনফার্ম হলেই বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী চিকিত্সা দেওয়া যাবে। তিনি দায়িত্ব নিয়েই বলেন এটিই সরকারের প্রটোকল। তিনি সাধারণ মানুষকে হুজুগে মেতে বা গুজবে কান দিয়ে অথবা ফেসবুক দেখে ওষুধ না কেনার জন্য পরামর্শ দেন।

করোনা ভাইরাসের চিকিত্সায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন এখনো স্বীকৃত নয়, তবে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ভারতসহ বিশ্বের বহু দেশ করোনার চিকিত্সায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ও অ্যাজিথ্রোমাইসিন চিকিত্সায় অনেক ক্ষেত্রে সুফল পাওয়া গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞগণ বলছেন করোনা চিকিত্সায় মাত্র ১২টি ম্যালেরিয়ার ট্যাবলেট হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন এবং মাত্র পাঁচটি অ্যাজিথ্রোমাইসিন নামক অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয়। এ জাতীয় কোনো ওষুধ আগাম মুজত করার প্রয়োজন নেই। এ ব্যাপারে ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব এস এম শফিউজ্জামান জানান, দেশে করোনা ভাইরাসের চিকিত্সার প্রয়োজনীয় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন এবং অ্যাজিথ্রোমাইসিনের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তিনি সাধারণ মানুষকে হুজুগে ওষুধ না কেনার পরামর্শ দেন।