বাস্তবে বহু ঘাটতি

ঢাকায় একটি জাতীয় দৈনিকে কর্মরত একজন সাংবাদিক তার ফেসবুকে লিখেছেন, তার এক নিকটাত্মীয় জ্বর, সর্দি, কাশি ও গলাব্যথায় ভুগছিলেন। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে আত্মীয়কে নিয়ে তিনি রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে যান। কিন্তু হাসপাতালের কোনো চিকিৎসক তাকে প্রাথমিক কোনো সেবা দেননি, রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করাতেও অপারগতা জানান। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে ঐ সাংবাদিক জানতে চান, তাহলে রোগীকে তিনি কোথায় নেবেন?

 

কর্তৃপক্ষ তাকে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সঙ্গে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দেয়। কিন্তু গভীর রাত পর্যন্ত চেষ্টা করেও ঐ সাংবাদিক আইইডিসিআরের হটলাইনে ঢুকতে পারেননি। সবশেষে অসহায় আত্মীয়কে বাসায় নিয়ে যান ঐ সাংবাদিক। সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও আইইডিসিআর প্রতিদিনই করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। একই সঙ্গে ‘সব ধরনের প্রস্তুতি’র কথা জানালেও বাস্তবে এরকম বহু ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এমন সন্দেহে নমুনা পরীক্ষার সুযোগও পাচ্ছেন না আক্রান্তদের বেশির ভাগই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আইইডিসিআরসহ সংশ্লিষ্ট স্থানে অপেক্ষা করেও নমুনা পরীক্ষা করাতে পারছেন না। আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বারবারই বলছেন, রোগীরা যেন আইইডিসিআর কিংবা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ভিড় না করে হটলাইনে যোগাযোগ করেন। কিন্তু বেশির ভাগের অভিযোগ, তারা হটলাইনে ঢুকতেই পারছেন না।


গতকাল ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে এরকমই অভিযোগ করেন রাজধানীর বাংলামোটরে বসবাসকারী জাহিদুর রহমান। তিনি জানান, তার বৃদ্ধা মা দুই দিন ধরে জ্বর, সর্দি ও কাশিতে ভুগছেন, তিনি আগে থেকেই হার্টের রোগী। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে নমুনা পরীক্ষা করানোর জন্য অসংখ্যবার চেষ্টা করেও তিনি আইইডিসিআরের হটলাইনে যোগাযোগ করতে পারেননি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হটলাইনেও ঢুকতে পারেননি। নিরুপায় হয়ে তিনি মাকে নিয়ে বাসাতেই রয়েছেন। কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না।

 

সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো থেকে মানুষের উদ্দেশে বলা হচ্ছে, তারা যেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকেন। হ্যাক্সিসল ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করেন। ডেটল ও সেভলনের মতো জীবাণুনাশক দিয়ে যেন বাসা ও অফিস পরিষ্কার রাখেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এসব সামগ্রী বর্তমানে বাজারে দুষ্প্রাপ্য। কোথাও কোথাও পাওয়া গেলেও নিম্ন কিংবা স্বল্প আয়ের মানুষের পক্ষে এসব পণ্য কেনা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি-বেসরকারি বেশির ভাগ কর্মস্থলেও এসব পণ্যের সরবরাহ এখনো নিশ্চিত হয়নি। রাজধানীর রামপুরা, মালীবাগ, উত্তরা, মতিঝিলসহ কয়েকটি স্থান ঘুরে দেখা গেছে, ওষুধের দোকানগুলোতে প্যারাসিটামল, খাওয়ার স্যালাইন এবং ঠান্ডা ও কাশির সাধারণ ওষুধের সরবরাহও স্বাভাবিক নেই। শনিবার রাতে নগরীর রামপুরা বনশ্রীতে বেসরকারি একটি ব্যাংকে কর্মরত আফজালুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, এলাকার বেশ কয়েকটি ওষুধের দোকান ঘুরেও তিনি হ্যাক্সিসল, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ডেটল, সেভলন পাননি। এমনকি সাধারণ প্যারাসিটামল পেতেও তাকে বেগ পেতে হয়েছে। জরুরি এসব সামগ্রীর পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার বলে মত দেন এই ব্যাংক কর্মকর্তা।

 

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বারবারই গণপরিবহন এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন। ঝুঁকি জেনেও কর্মস্থলে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষের বিকল্প কোনো যানবাহন না থাকায় বাধ্য হয়েই তাদের চড়তে হচ্ছে গণপরিবহনে। কিন্তু রাজধানীর গণপরিবহনগুলোতে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব রোধে ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থাও এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের জন্য গণপরিবহন উচ্চ ঝুঁকিতে থাকলেও চালক, হেলপার, যাত্রী—সবাই চলছেন আগের মতোই। গৃহকর্মী ও ব্যক্তিগত গাড়িচালকদের নিয়েও বাড়তি ঝুঁকিতে রয়েছেন অনেকে। নিজেরা সতর্ক হলেও গৃহকর্মী ও গাড়িচালকদের সতর্কতা নিয়ে বেশির ভাগ মানুষই শঙ্কায়। এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাও পাচ্ছেন না বলে কারো কারো অভিযোগ। ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে কয়েক জন জানান, বিশেষ করে বস্তিবাসীদের দিকে বাড়তি নজর দেওয়া জরুরি। কারণ পোশাকশ্রমিক, গৃহকর্মী ও খেটে খাওয়া দিনমজুররা সাধারণত বস্তিতে বসবাস করেন। সারা দিন বিভিন্ন স্থানে ও নানাজনের সঙ্গে কাজ করার পর তারা বস্তিতে ফেরেন, বসবাসও করেন বেশি ঘনত্বের ঘরে। কিন্তু তাদের সতর্ক করার ও পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে সরকারিভাবে তেমন কোনো উদ্যোগ এখনো চোখে পড়েনি।

 

এদিকে সতর্কতার অংশ হিসেবে সাধারণ মানুষের একটি বড়ো অংশ কয়েক দিন ধরে বাসার বাইরে যাচ্ছেন না। এতে বিপাকে পড়েছেন অক্টোরিকশাচালক ও রিকশাচালকেরা। যাত্রীর সংকটে জীবিকা নির্বাহে প্রয়োজনীয় রোজগার নিয়ে তারা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। মোদাব্বির শেখ নামে একজন অটোরিকশাচালক গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, বড়ো ঝুঁকি জেনেও কেবল রুটিরুজির জন্য তাদের রাস্তায় নামতে হচ্ছে। এক দিন গাড়ি না চালালে ঘরে খাবার মিলবে না। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও যাত্রী মিলছে না। আগে যেখানে দিনে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা আয় হতো, সেখানে এখন ৫০০ টাকা আয় করতেও কষ্ট হচ্ছে, মালিকের জমা তুলতেই দিন পার হয়ে যায়। মোদাব্বিরের মতো দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষের মধ্যে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের অর্থনৈতিক প্রভাব ইতিমধ্যে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। ‘এখন যে টাকা কামাই, তা দিয়ে খামু, নাকি ওষুধ কিনমু’—মগবাজারে থাকা রিকশাচালক কাশেমের এই কথাতেই এর প্রতিফলন টের পাওয়া যায়।

 

ইত্তেফাক/এএম