আলোকপাত

পঁচিশে মার্চ

আটচল্লিশ থেকেই বাঙালি চেয়েছিল সত্যিকার স্বাধীন জাতির মর্যাদা পেতে। দাবি উঠেছিল স্বায়ত্তশাসনের। শাসনতন্ত্রে জুড়ে দেওয়া হয় একের পর এক স্বায়ত্তশাসনের ভেলকি। আর বাঙালি প্রত্যাখ্যান করতে থাকে ভেলকিতে ভুলতে। ছেষট্টি সালে প্রণয়ন করা হলো ছয় দফা। দাবি উঠল, ছয় দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। তার কমে রাজি নয় বাঙালি। গড়ে উঠল আন্দোলন। যত সোচ্চার হলো দাবি আর তীব্র হলো আন্দোলন—তীব্রতর হলো নিষ্পেষণ। আন্দোলন পরিণত হয় সংগ্রামে। রক্তপাত হলো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। শাসকগোষ্ঠীতে ঘটল ব্যক্তির পরিবর্তন একের পর এক। ভেদনীতি, তোষণ ও পোষণনীতি, শঠতা, চোখ রাঙানি, মিঠে বুলি, সবকিছুর আশ্রয় নেয় শাসকগোষ্ঠী পর্যায়ক্রমে। বাঙালি তার দাবিতে অনড়। অবশেষে শাসকগোষ্ঠী আঘাত হানল তীব্রতম ক্রোধ আর কাঠিন্যে। রক্তাক্ত হলো পঁচিশে মার্চ। বাঙালি প্রত্যাঘাত করল সমতীব্রতায়। ঘোষণা করল স্বাধীনতা। রুখে দাঁড়াল অস্ত্র হাতে সশস্ত্র বাঙালি। প্রাণ দিল শত-সহস্র নয়, লক্ষ লক্ষ। পঁচিশে মার্চ থেকে ষোলোই ডিসেম্বর একটানা বিভীষিকাময় কালরাত্রির শেষে সূর্যোদয়। একনদী রক্ত সাঁতরে স্বাধীন বাংলাদেশের তীরে পৌঁছল মুক্তিপাগল বাঙালি।

আজ পঁচিশে মার্চ। সাল বাহাত্তর। কোনো বিশেষ দিন নয়—আর যে কোনো দিনের মতো একটা সাধারণ দিন। অফিস-আদালত বসেছে, স্কুল-কলেজ চলেছে, দোকানপাট খুলেছে। কাল ছাব্বিশে মার্চ—স্বাধীনতা দিবস। একটা বিশেষ দিবস। একুশে ফেব্রুয়ারি শোক করেছি, ওটা ছিল শোক দিবস। কাল আনন্দ করব। ওটা স্বাধীনতা দিবস। কিন্তু বাঙালির পঞ্জিকায় পঁচিশে মার্চ থাকল একটা সাদামাটা দিন যা চিহ্নিত নয় বিশেষ দিন বলে। বাঙালির ইতিহাসে পঁচিশে মার্চের থাকবে না কোনো উল্লেখ। এটা হবে একটা বিস্মৃত দিন। আজকের এটাই বিধান। কিন্তু বিধান কি ইতিহাস সৃষ্টি করে? ঘটনা সৃষ্টি করে ইতিহাস। বিধানের পেছনে থাকে উদ্দেশ্য। কিন্তু বিধান স্বল্পমেয়াদি। ইতিহাস চিরস্থায়ী। বিধানদাতার পরিবর্তনে ইতিহাস পুনর্লিখিত হয়। মিথ্যার বদলে স্থান পায় সত্য। ‘হলওয়েল মনুমেন্ট’ যায় ভেঙে, অন্ধকূপ হত্যার মিথ্যা ঘটনা মুছে যায় ইতিহাসের পাতা থেকে।

এ বিধান চিরস্থায়ী হতে পারে না। সফল হতে পারে না বাঙালির পরিচয়কে ছোটো করে আন্দোলনকারী জাতি হিসেবে দেখাবার অপচেষ্টা। একুশের স্মৃতিচারণ ভোলাতে পারবে না তার পঁচিশেকে। বাহান্নর মৃদু রক্তক্ষরণ ভোলাতে পারবে না তার একাত্তরের রক্তনদীকে। জাতির ভাষার দাবির কাহিনি ভোলাতে পারবে না তার রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাসকে। সে জানে, ভাষা জাতির আত্মপরিচয়ের অঙ্গ মাত্র, কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িত তার অস্তিত্ব। জানে বলেই সে প্রাণ বাজি রেখেছিল একাত্তরের ইতিহাস সৃষ্টির সংগ্রামে। সময় ইতিহাস লিখবে। সে ইতিহাসে পঁচিশে মার্চ পরিচয় পাবে বাঙালির ‘সশস্ত্র সংগ্রাম দিবস’ হিসেবে। বিশ্ববিবেকের পঞ্জিকায় পঁচিশে মার্চ থাকবে মানবজাতির কৃষ্ণতম শোক দিবস হিসেবে।

(১৯৭২ সালে চক্রবাক সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদের পক্ষে প্রকাশিত ‘সৃষ্টির যন্ত্রণা’ নামক সংকলেনে প্রকাশিত)