করোনা মহামারি মোকাবিলায় ভারত, যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকায় ২১ দিনের ‘লকডাউন’ এবং থাইল্যান্ডে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। গতকাল দেশ চারটি এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়। গাম্বিয়ায় বাংলাদেশি এক ইমামের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে ইতালিতে একদিনে মৃত্যু হয়েছে ৭৪৩ জনের। সৌদি আরবে প্রথমবারের মতো একজন মারা গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে, করোনা মহামারি আরো ‘বেগবান’ হচ্ছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় চার লাখ এবং মৃতের সংখ্যা ১৮ হাজার ছাড়িয়েছে।
ভারতে ২১ দিনের লকডাউন
ভারতে নোভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে ৫শ’ ছাড়িয়েছে। গতকাল জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তিন সপ্তাহের ‘লকডাউন’ ঘোষণা করেন। মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত লকডাউন জারি থাকবে। তিনি বলেন, এ সময় দেশের নাগরিকরা বাড়ির বাইরে যেতে পারবেন না। তিনি নাগরিকদের উদ্দেশে বলেন, কয়েকদিন বাইরের জীবন ভুলে যান। এটা না করলে দেশ আরো ২১ বছর পিছিয়ে যাবে।
লকডাউন যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকায়ও
ইউরোপের আরো অনেক দেশের মতো যুক্তরাজ্যেও লকডাউন ঘোষণা করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। সোমবার রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিন সপ্তাহের এই বিধিনিষেধ জারি করেন তিনি। নাগরিকদের সবাইকে বাসায় অবস্থান করতে বলা হয়েছে। জরুরি নিত্যপণ্যের বাইরে অন্যসব পাণ্যের দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাইরে একসঙ্গে দুইজনের বেশি চলাফেরা করা যাবে না। নির্দেশনা না মানলে জরিমানা। দেশটি সেনাবাহিনীর সহায়তায় অস্থায়ী হাসপাতাল তৈরি করবে বলে জানিয়েছে। এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট ক্রিল রামাফোসা জানিয়েছেন, ২৬ মার্চ মধ্যরাত থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত লকডাউন থাকবে। গতকাল পর্যন্ত দেশটিতে আক্রান্ত হয়েছে ৫৫৪ জন। এক সপ্তাহ আগে ছিল মাত্র ৬৪ জন।
থাইল্যান্ডে জরুরি অবস্থা
দেশটির প্রধানমন্ত্রী প্রায়ূথ চান ওঁচা গতকাল জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার থেকে এক মাসের জরুরি অবস্থা কার্যকর হবে। মন্ত্রিসভা এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন দিয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী এ সময় সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার থেকে সবাইকে দূরে থাকার আহ্বান জানান। দেশটিতে নতুন করে ১০৬ জন আক্রান্ত হওয়ায় মোট আক্রান্ত ৮২৭। এর মধ্যে তিনজন চিকিত্সা কর্মকর্তাও আছে। মারা গেছে ৩ জন।
কড়া হুঁশিয়ারি হু’র
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) সতর্ক করে বলেছে, করোনাভাইরাস থেকে সৃষ্ট মহামারি আরো বাড়ছে। সংস্থাটির প্রধান ডা. টেড্রোস অ্যাধনম ঘেব্রেইয়েসাস ফুটবল খেলোয়াড়দের নিয়ে ‘কিক আউট করোনাভাইরাস’ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একথা বলেন। চলতি সপ্তাহে জি-২০ জোটভুক্ত নেতাদের তিনি আহ্বান জানাবেন যাতে তারা সুরক্ষা সরঞ্জামের উত্পাদন বাড়ায় এবং সেগুলো রপ্তানির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।
গাম্বিয়ায় বাংলাদেশি ইমামের মৃত্যু
গাম্বিয়ায় বাংলাদেশি এক ইমামের মৃত্যু হয়েছে। ছয়টি দেশ ঘুরে গাম্বিয়ায় গিয়েছিলেন ঐ ইমাম। করোনায় সংক্রমিত হয়ে সেখানেই মারা যান তিনি। গাম্বিয়ায় মৃত দুজনের মধ্যে দ্বিতীয়জন বাংলাদেশি বলে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। ডায়াবেটিসের জটিলতার কথা উল্লেখ করে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। বাংলাদেশি ইমাম যাদের সংস্পর্শে গিয়েছিলেন তাদেরও খুঁজছে পুলিশ।
অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি
চীনে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও পৃথিবীর অন্যান্য দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে ইউরোপের দুইটি দেশ ইতালি ও স্পেনের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। ইতালিতে ২৪ ঘন্টায় ৭৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা পৌছেছে ৬ হাজার ৮২০ জনে। আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার। দেশটির এক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, আক্রান্তের সংখ্যা এর দশগুন বেশি হতে পারে। এদিকে স্পেনে ২৪ ঘন্টায় ৫১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে সাড়ে ছয় হাজার মানুষ আক্রান্ত হওয়ায় দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ৩৯ হাজার ৬৭৩ জন। ইরানে একদিনে মারা গেছে ১২২ জন। নতুন আক্রান্ত ১ হাজার ৭৬২ এবং মোট আক্রান্ত ২৪ হাজার ৮১১ জন। যুক্তরাষ্ট্রে ২৯ জনের মৃত্যুর মধ্যে মোট মৃত ৫৮২ জন। জার্মানিতে ২৪ ঘন্টায় সাত জনের মৃত্যুতে মোট ১৩০ জন মারা গেছে এবং আরো এক হাজার ৯৪ জন নতুন আক্রান্ত হয়ে মোট আক্রান্ত ৩০ হাজার ১৫০ জন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটি, নিউ জার্সি এবং লং আইল্যান্ড অঙ্গরাজ্যে প্রতি হাজারে একজন আক্রান্ত। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় পাঁচগুণ বেশি আক্রান্ত এসব রাজ্যে। এদিকে চিকিত্সা সামগ্রীর অভাবে ‘নিউইয়র্কের পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে’ সতর্ক করে শহরের মেয়র বিল ডে ব্ল্যাসিও বলেন, আগামী ১০ দিনের মধ্যেই এসবের মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ফলে মৃতের সংখ্যাও বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্ত ৪৩ হাজার ৭৩৪ এবং মৃত্যু ৫৫৩ জন। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে, তাদের ১৭৪ জন সদস্য আক্রান্ত। করোনা মোকাবেলায় সরকার দুই ট্রিলিয়ন ডলারের সহায়তা ঘোষণা করলেও তা কংগ্রেসে পাশ হয়নি। অন্তত ৫ রিপাবলিকান সিনেটর করোনায় হয় আক্রান্ত না হয় সেলফ কোয়ারেন্টাইনে। ফলে সিনেটর কমে গেছে। তবে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে বলে জানা গেছে। সূত্র : আল-জাজিরা, এনডিটিভি এবিসি নিউজ ও রয়টার্স