জয়িতা শিল্পী
ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট থানা, পাহাড়ের পাদদেশে একটি সবুজ গ্রাম। সেখানে কাদামাটি আর ফুলে-ফসলে মানুষগুলো বেড়ে ওঠে। গারো সম্প্রদায়ের আবাস এ অঞ্চলে চোখে পড়ার মতো। শান্তিপ্রিয় মানুষের সরল জীবনযাপন। তবে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা এ অঞ্চলের মানুষকেও কঠিনভাবে আঘাত হেনেছিল।
রুমেছা বেগম (দুখু), ১৯৭১ সালে বয়স পনেরো কি ষোলো। সদ্য বিয়ে হয়েছে। পাশের গ্রামের সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে। মাত্র আট/দশ দিন। এরই মাঝে শোনা গেল আকনপাড়া কলোনি সরকারি আদর্শ হাইস্কুলে মিলিটারি ক্যাম্প বসানো হয়েছে। অন্য সকল গ্রামের মতো এখানেও থমথমে পরিবেশ। আশপাশের কোনো বাড়ির যুবক বা কর্মী, পুরুষ বাড়িতে থাকে না মিলিটারি ধরে নিয়ে যাবে এই ভয়ে। বাড়িতে শুধু বৃদ্ধ, নারী ও শিশুরা। রুমেছা বেগমের যুদ্ধদিনের করুণ ইতিহাস আজও মনে করিয়ে দেয় দুঃসহ দিনের বেদনার মুহূর্তগুলো। কি নির্মম! কি করুণ বাস্তবতা। খুব সরল-সোজা ছিল রুমেছা বেগম। তার স্বামীও খুব সাধারণ।
এক ভরদুপুরে বাড়িতে পুরুষ মানুষ কেউ নেই। অকস্মাত্ দুই মিলিটারি ঢুকলো বাড়িতে। রুমেছা বেগম একা বাড়িতে। যুবতি বউ। বর্বর দুই মিলিটারি পশুর মতো খাবলে নিল রুমেছা বেগমের শরীর। কি করুণ ! তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকলেন মাটিতে। এ সময় বৃদ্ধা কয়েকজন মহিলা প্রতিবেশী বাড়িতে এসে দেখে রুমেছা বেগম অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে। তারা মাথায় পানি ঢেলে, প্রাথমিক চিকিত্সা দিয়ে রুমেছা বেগমকে সুস্থ করে তোলে। সেই থেকে রুমেছা বেগমের দুর্দশার দিন শুরু। স্বামীর বাড়ির লোকজন তাকে আর দেখতেই পারে না। এ বউ পাকিস্তানী মিলিটারির নির্যাতনের শিকার। এ বউ অপবিত্র, তাকে এ বাড়িতে আশ্রয় দেওয়া অপমানের, লজ্জার। এই পরিবেশের মধ্যেই চুপ করে থাকে রুমেছা বেগম। কারণ তার কোনো যাওয়ার জায়গা নেই। জন্মের আগেই বাবা মারা গেছে, একা মায়ের সংসারে কে তার দায়িত্ব নেবে? যার দায়িত্ব নেওয়ার কথা তার স্বামী সে তো তাকে আর সংসারে আশ্রয় দিতে চায় না। তার শ্বশুর শাশুড়ির সঙ্গে সুর মিলিয়ে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলে। এভাবে ছয়-সাত মাস চলে যায়। রুমেছা বেগম স্বামী সিরাজুল ইসলামের মন জুগিয়ে চলার চেষ্টা করেন। ভয়ে ভয়ে থাকেন আবার কী ভুল হয়ে যায়। এভাবে চলতে চলতে রুমেছা বেগম গর্ভবতী হয়ে পড়েন। তার কোল জুড়ে সিরাজুল ইসলামের ছেলেসন্তান আসে। তার নাম রাখা হয় রফিকুল ইসলাম। রুমেছা ভাবেন এবার বুঝি তার কপাল ফিরবে। কিন্তু সেটি আর হয় না। সারাক্ষণ খোঁচা দিয়ে কথা বলা হয়। তিনি অপয়া, নষ্টা, এজন্য স্বামীর উন্নতি হয় না। নানান কটু কথা শুনে নবজাতককে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে পড়ে থাকেন রুমেছা কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না। রুমেছাকে সন্তানসহ বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। রুমেছা আবার মায়ের কাছে ফিরে আসেন। মায়ের সংসারে অভাব-অনটনে ছোটো সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকাটাই দুষ্কর। স্বামী বা স্বামীর বাড়ির কোনো লোক তার খোঁজখবর নেন না। রুমেছা ধীরে ধীরে ভুলে যেতে থাকেন তার স্বামী ছিল, সংসার ছিল—সব ছিল। সব ভুলে একমাত্র সন্তানকে বড়ো করার চিন্তায় মগ্ন। খেয়ে না খেয়ে, এর ওর বাড়িতে কাজ করে, খাবার চেয়ে নিয়ে সন্তানকে, মাকে খাইয়েছেন। নিজে হয়তো ঠিকমতো খাবার পাননি। একটু একটু করে কষ্ট স্বীকার করে সন্তানকে লালন পালন করে বড়ো করেছেন। তাই তিনি ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন।
তার ছেলে রফিকুল ইসলামের বয়স যখন ছয় বছর তার স্বামীর বাড়ির লোকজন এসে তার কাছ থেকে ছেলেকে কেড়ে নিয়ে যায়। এতদিন যে সন্তানের মুখ চেয়ে সবকিছু সহ্য করেছেন, রুমেছা বেগমের সেই নয়নমণিকে তার থেকে কেড়ে নেওয়া হলো। তার মনে হতে লাগলো আল্লাহ তাকে বার বার কেন কঠিন পরীক্ষায় ফেলেন? জন্মের আগেই বাবাকে হারালেন। যুদ্ধের সময় করুণভাবে মিলিটারির দ্বারা নির্যাতিত হয়ে, স্বামীর বাড়ি লাঞ্ছনা-গঞ্জনা দিয়ে সেখান থেকে তাকে বের করে দেওয়া হলো, এরপর নিজের সন্তানকে তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হলো? জীবনে আর কি হবে? কত কষ্ট আল্লাহ তাকে দেবেন? নানান দুশ্চিন্তায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর ধীরে ধীরে আবার কিছুটা সুস্থ হন, আগের মতো মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে কাজকর্ম করে জীবনকে বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা করেন রুমেছা। এরপর রুমেছা বেগমের জীবনে নেমে আসে আরেকটি ঘটনা। মহর আলী নামে একজন রুমেছা বেগমকে বিয়ে করতে চান। তিনি তিন কন্যাসন্তানের জনক। তার স্ত্রী নাই। রুমেছা বেগম এই বিয়েতে সম্মত হন। ভাবেন যদি কোনো আশ্রয় মেলে। মানুষের বাড়িতে কাজ করে খাবার থেকে এই সিদ্ধান্ত ভালো। তাই বিয়ে করে বড়ো বড়ো সন্তানকে নিয়ে নতুনভাবে বাঁচতে চেষ্টা করেন। জীবনে যত পরিবর্তনই আসুক না কেন রুমেছা বেগম অতীতকে কিছুতেই ভুলতে পারেন না। সবকিছু বুকের মধ্যে চেপে রেখে নতুন স্বামীর সংসারে মন বসাতে চেষ্টা করেন রুমেছা। এক এক করে দিন-মাস-বছর কাটে। নতুন সংসারে রুমেছা বেগমের আর একটি পুত্রসন্তান জন্ম নেয়। তার নাম রাখা হয় মো. সালে মুসা। মুসাই রুমেছা বেগমের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বনে পরিণত হয়। এই সন্তানই তাকে সব আনন্দ, সুখ দিয়েছে। মায়ের মর্যাদা দিয়েছে। মুসা জানে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকবাহিনীর দ্বারা তার মা নির্যাতিতা হয়েছেন, কিন্তু এটি তার কাছে লজ্জার নয়, অহংকারের। সে জানে এটি একটি ইতিহাস, মহান মুক্তিযুদ্ধের, তার মায়ের মতো শত শত নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কেউ সন্তান বাঁচাতে, কেউ পরিবারের আপনজনকে বাঁচাতে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। মুসা বিয়ে করে সংসারি হয়েছে। তারও দুই সন্তান। সবাইকে নিয়ে মুসা একত্রে থাকে। মুসা সবসময় তার মাকে তার কাছে রাখেন। রুমেছা বেগম মুসাকে তার ভরসা মনে করেন। রুমেছা বেগম মনে করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার মতো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সম্ভ্রম হারানো নারীদের মুক্তিযোদ্ধা খেতাব দিয়ে নতুন জীবন দিয়েছেন।
n লেখক :অ্যাডিশনাল এসপি (অ্যাডমিন), ময়মনসিংহ