নতুন করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ বর্তমানে গোটা বিশ্বে এক আতঙ্কের নাম। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম পৃথিবীজুড়ে মানুষের মধ্যে মৃত্যুভয় জাগিয়ে তুলেছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ। বাংলাদেশেও করোনার থাবা বিস্তৃত হয়েছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যার চেয়েও বেশি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে আতঙ্ক। অতি আতঙ্ক মানুষের মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে। মনের এই আতঙ্ক রোগ থেকে মুক্ত থাকাই এখন অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতি আতঙ্কের কারণে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। মানসিক চাপ কমাতে আতঙ্কিত বা ভীত না হয়ে চলমান পরিস্থিতিকে মানিয়ে নিতে হবে। নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হবে। করনোভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পাশাপাশি বাসায় বই পড়া, কাজে ব্যস্ত থাকা, মেডিটেশন ও নিয়মিত শরীরচর্চা মানসিক চাপ কমাতে দারুণ সুফল দিতে পারে। এছাড়া শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিকারক খাদ্য যেমন- ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল, কিসমিস, খোরমা, পাস্তা বাদাম- ইত্যাদি নিয়মিত ও পরিমাণমত খেতে হবে। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এ-ও বলছেন, কিছুটা আতঙ্ক থাকাও ভালো, এর ফলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ে।
দেশের বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহিত কামাল গতকাল বুধবার ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, করোনা একটি দুর্ধর্ষ ও প্রাণঘাতী ভাইরাস, এটা মানুষকে হত্যা করে, এর কোনো চিকিত্সা নেই- মানুষের মস্তিস্কে যখন এটা ঢুকে তখন তিন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কারও আতঙ্কের মাত্রা ৯০ থেকে ১০০ ডিগ্রি হয়ে যায়, কারও ৫০ এর মধ্যে থাকে আবার কারও কারও আতঙ্কের মাত্রা ১০ ডিগ্রি বা এর নিচে থাকে। যাদের আতঙ্কের মাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে তার মানে তারা বিষয়টিকে পাত্তা বা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। যারা পাত্তা দিচ্ছেন না মূলত তারাই এই মরণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটাচ্ছেন।
ডা. মোহিত বলেন, অতি আতঙ্ক মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করে। এতে তার মধ্যে উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা, হতাশা ও বিষাদ জন্ম নেয়। যার ফলে তার মধ্যে সমস্যা সমাধানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা লোপ পায়। পরিবারের যে সদস্য কাজের জন্য ঘরের বাইরে যাচ্ছেন এবং যারা মানুষকে বিভিন্নভাবে সেবাদানে নিয়োজিত তার জন্য পরিবার ও স্বজনরা উচ্চ মাত্রার উত্কণ্ঠায় ভোগেন। পরিবারের প্রিয় মানুষটি আক্রান্ত হয়ে পড়েন কিনা- এটা ভেবে সারাক্ষণ বিষাদে ভুগতে থাকেন। এটা বড় সমস্যা। তার মতে, যাদের আতঙ্কের মাত্রা ৫০ ডিগ্রি বা এর কাছাকাছি (যেটিকে চিকিত্সা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয়- অপটিমাম লেভেল) থাকবে তারা পরিস্থিতিকে সহজে মানিয়ে নিতে পারবেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঠাণ্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কিন্তু অতি আতঙ্কগ্রস্তরা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। ব্যক্তিগত আতঙ্কের কারণে সবকিছু এলোমেলো করে ফেলবেন, ভুল থেকে ভুল সিদ্ধান্ত নেবেন।
মানসিক চাপ কমাতে করণীয় সম্পর্কে মোহিত কামালের পরামর্শ, আতঙ্কের মধ্যেই ইতিবাচক দিকগুলো ভাবতে হবে। যেমন আমাদের দেশে তো এখনও ভয়াবহ পরিস্থিতি হয়নি, যেটুকু হয়েছে সেটুকুর মধ্যেই সংযত থাকতে হবে। আমাকে, পরিবারকে, সমাজকে, দেশকে বাঁচাতে হবে- এটা আমার দায়িত্ব, এভাবে ভাবা দরকার।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মেখলা সরকার বিবিসিকে বলেছেন, যখন কোনো সংকটের মধ্যে আমরা পড়ি, তাতে একেকজন মানুষ একেকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। উদ্বিগ্নতা যখন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়, মানুষ যখন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন, তখন তাদের মধ্যে নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। সেটা তার বর্তমান সময়কে মোকাবেলা করতে দুরূহ করে তোলে। তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হয়, মানুষ ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
মানসিক চাপ কাটিয়ে উঠতে মেখলা সরকারের পরামর্শ, সামাজিক মাধ্যমের সব তথ্যই বিশ্বাস করা যাবে না, নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য গ্রহণ করতে হবে। সেই সঙ্গে ভাবতে হবে, শুধু আমি একা নই, প্রতিটা মানুষ এই সমস্যার ভেতরে রয়েছেন। ভীত বা বিহ্বল না হয়ে বরং নিজের ওপর আস্থা রাখতে হবে ও শারীরিক দূরত্ব গড়ে তুলতে হবে। তবে সবার সঙ্গে টেলিফোনে, ম্যাসেঞ্জারে নিয়মিত কথা বলতে হবে, পরস্পরের খোঁজখবর নিতে হবে। তাহলে একা থাকলেও, বিচ্ছিন্ন থাকলেও সেটি মানসিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করবে না।