ভাগ্যান্বেষণে মানুষ কোথা থেকে যে কোথায় যায়, সে নিজেও তা জানে না। লাল চান ফকিরের ভাগ্যের লিখনও এ-রকম। জন্মভূমি টাঙ্গাইল থেকে সে চলে যায়। আসাম হয় তার গন্তব্য। তখন ব্রিটিশ-ভারতের যুগ। রাষ্ট্রের কোনো সীমারেখা ছিল না, যে-যেখানে পারত, যেত। আসামে তখন অনেকেই পাড়ি জমায়। বন্যা ছিল এর মূল কারণ। সে-সময় টাঙ্গাইল পানিতে ভাসত। কয়েক মাস তো পানি নামতই না। অস্বস্তি-উত্কণ্ঠার মধ্যে দিন কাটত মানুষের। মানুষের মনে স্বতঃস্ফূর্ত একটা ইচ্ছাশক্তি সতত তাকে তাড়া করে ফেরে, তার অবস্থানটা আরো ভালো করবার। লাল চান ফকিরের সুপ্ত ইচ্ছাটা একদিন পাখা মেলে উড়াল দেয় অজানা অন্য দেশের পানে। পৃথিবীর অন্য কিছু দেখবার-জানবার প্রবল ইচ্ছাটা তাকে এ-রকম করে। সমাজের আর দশজনের মতো সে নয়। একদম নিজস্বতায় সুন্দর ইচ্ছাটা তাকে জড়িয়ে থাকে। সম্পূর্ণ আলাদা। প্রকৃতি-অন্তঃপ্রাণ। নিজেই গান বেঁধে বেঁধে গায়। তার গানের বাণী যেন পাপমুক্ত মানুষ তৈরি করে। সবার মনে তা মধুর ধ্বনি হয়ে বাজে। আসামে তার স্বচ্ছন্দ চলার গতি যে হঠাত্ থেমে যাবে তা লাল চান ফকির কখনো ভাবে নাই। ভাবনার মধ্যে তা ছিলও না।
ভারত ভাগ-ই লাল চান ফকিরের জন্য দুর্ভাগ্য বয়ে আনে। মাথার ওপরের স্বস্তির আকাশটা যেন ভেঙে পড়ে। লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরবাড়ি-সহায়সম্পদহারা হয়। কপালে আগুন লাগে। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে মানুষে-মানুষে হত্যা-নৃশংসতা সংঘটিত হয়। লাল চান ফকির ফের টাঙ্গাইল চলে আসে। সে-অনেক বছর পর। একদম নিঃস্ব হয়েই আসে। আসাম যাওয়ার কালে তার ভাইয়ের কাছে বাড়িভিটাসহ একখণ্ড জমিও রেখে গিয়েছিল সে। লাল চান ফকির মাথা গোঁজার ঠাঁই সেই ভিটা ও জমিটুকু আর ফিরে পেল না। দেখল, ভাইয়ের দখলে তা। একটু আশ্রয় ও একবেলা আহারও জুটল না তার। পৃথিবীর এক অদ্ভুত নিয়মের কথা লাল চান ফকির মনে মনে ভাবে—‘তুমি যার জন্য এত করলে, সে-ই তোমার দুঃখের কারণ হবে।’ রক্ত-সম্পর্কিত এমন মমত্বহীন ব্যবহার ভাইটা কী করে করল? অবিশ্বাস্য মনে হয় তার। আসাম যেভাবে তাকে গলাধাক্কা দিয়ে বের করেছে, ভাইটাও তাই করল। মনুষ্যত্বহীন হওয়া মানেই লোভের পরাকাষ্ঠা। সে ভাবে, মানুষ এতই খারাপ? দুঃখজর্জর জীবনের পাওনাটা এমনই। লাল চান ফকির তাই অন্যত্র কোথাও, সে তার পরিজন নিয়ে চলে গেল।