নির্বাচন এসে গেলো। এখন ভোটারদের সিদ্ধান্ত নেয়ার পালা— ভোট দেব কাকে? এ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে ভোটাররা তিন ভাগে বিভক্ত। এক ভাগে দলীয় নেতা-কর্মী, যাদের ভোট নিজ নিজ দলীয় প্রার্থীর পক্ষে নিশ্চিত। অন্য ভাগে দলীয় শুভাকাঙ্ক্ষী, নীরব সমর্থক— এদের ভোট দলীয় প্রার্থীর সঙ্গে অন্য দলীয় প্রার্থীর তুলনামূলক বিচারের উপর নির্ভর করে। এর বাইরে আছে অগণিত সাধারণ ভোটার— যাদের কোনো সুনির্দিষ্ট দলীয় সমর্থন নেই, যারা সিদ্ধান্ত নেন একেবারে শেষ মুহূর্তে। তাদের ভোটই ভোট-যুদ্ধে নিয়ামক হিসাবে কাজ করে।
কেমন ছিলো বাংলাদেশের মানুষ গত দশ বছর। ডাল-ভাতের কি খুব অভাব হয়েছিল? দু’বেলা কি মোটা ভাত খেতে পেরেছিল? নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কি তাদের নাগালের বাইরে ছিল? তাদের সুখে-দুঃখে সরকার কি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল? রোগে-শোকে কি তারা ন্যূনতম সরকারি স্বাস্থ্যসেবা পেয়েছে? তাদের সন্তানদের লেখা-পড়ার ক্ষেত্রে সরকার কি এগিয়ে এসেছে? বন্যা-খরাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে কি সরকারি সাহায্য এসেছে? যাতায়াতের কষ্ট কি কমেছে? এ রকম হাজারো প্রশ্নের উত্তরে জবাব শুধু একটাই— এর প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকার দৃষ্টান্তমূলক সাফল্য দেখিয়েছে। খাদ্যের অভাবে বাংলাদেশে এখন আর মানুষ মরে না। দেশে বস্ত্রহীন বলতে কেউ নেই। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা এখন জনগণের দোরগোড়ায়। উপজেলা পর্যায়ে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অতি দরিদ্র পরিবারটির সন্তানও স্কুলে যায়। কন্যাসন্তানটি আগে যায়। বিনামূল্যে বই পায়। সাথে উপবৃত্তির নামে বাড়তি কিছু টাকা পায়। টাকা পেতে কোনো ঝামেলা নাই। মা-বাবার মোবাইলে টাকা আসে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় ঘটেছে অভূতপূর্ব উন্নয়ন। বাংলাদেশে এমন কোনো গ্রাম নেই— যেখানে এক বা একাধিক রাস্তা পাকা নয়। দেশে কর্মসংস্থান বেড়েছে। জীবন-জীবিকার নিরাপত্তাহীনতা বহুলাংশে কমেছে। পরিবারে সচ্ছলতা এসেছে। মানুষের সামাজিক মর্যাদা বেড়েছে। গ্রামীণ জনপদেও ভোগের আকার-প্রকার স্ফীতি বেড়েছে। এগুলো মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও উন্নত জীবনমানের ইঙ্গিত দেয়। দেশে বিদ্যুতের সম্প্রসারণ হচ্ছে দ্রুতগতিতে। ফলে প্রতিদিন কিছু কিছু এলাকা বিদ্যুতের আওতায় আসছে। এর ফলে গ্রামীণ জনপদে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিকাশ ঘটছে। হচ্ছে কর্মসংস্থান। মোট কথা, সরকারের বিগত দুই মেয়াদের দারিদ্র্য দূরীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিক্ষা, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, ও অবকাঠামো নির্মাণসহ সার্বিক উন্নয়ন বিষয়ে মোটা দাগে কোনো জন-অসন্তোষ নেই।
যে দুটি বিষয়ে ১৯৭২ সাল থেকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হতো, সেই দুটি ইস্যুকেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ম্লান করে দিয়েছেন। এর একটি ভারত-প্রীতি ও অন্যটি ধর্ম। ভারত-প্রীতি সম্পর্কে বলতে হয়, ভারতের সাথে গত ১০ বছরে দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। অন্যদিকে সাধারণ ধর্মভীরু মুসলমানরাও আজ বুঝেছে, আওয়ামী লীগ ধর্মবিরোধী কোনো দল তো নয়ই, বরং এদেশে আওয়ামী লীগ ইসলাম ধর্ম ও মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বঙ্গবন্ধুর সৃষ্টি, তুরাগের পাড়ে তাবলিগের জমি বঙ্গবন্ধুর দেয়া। আর শেখ হাসিনা মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন-ভাতা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। সারাদেশে মসজিদ-মাদ্রাসার ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্প চলমান রয়েছে। সবচেয়ে বড় যে সিদ্ধান্তটি বর্তমান সরকার নিয়েছে তা হলো, বিগত দেড় শতাব্দির ঐতিহ্যবাহী কওমী শিক্ষার স্বীকৃতি-প্রদান। তাই বলতে হয়, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে ব্যবহূত ধর্ম ও ভারতপ্রীতি অস্ত্র দুটো আজ ভোঁতা হয়ে গিয়েছে। তবে আত্মতৃপ্তি বা আত্মতুষ্টির কোনো অবকাশ নেই।
অতি আত্মবিশ্বাসে হিতে বিপরীত ঘটে। প্রতিনিয়ত নিজেকে ডিঙিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হয়। বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রেও একথাটি প্রযোজ্য। শেখ হাসিনা দেশকে যেমন উন্নয়নের এক মহাসোপানে উন্নীত করেছেন, তেমনি তাঁর নেতৃত্ব সারাবিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে ব্যাপকভাবে। তাঁরই নেতৃত্ব গুণে বিশ্ব পরিম্ললে বাংলাদেশ পেয়েছে মর্যাদাবান রাষ্ট্রের স্বীকৃতি।তবে শত সাফল্যের মাঝেও বিভিন্ন নেতিবাচক কার্যক্রমে ক্ষমতাসীন দলের একশ্রেণির নেতা-কর্মীর সংশ্লিষ্টতা জনগণ ভালোভাবে নেয়নি। এ-কথা মানি, হাজারো কর্মব্যস্ততার মাঝে হয়তো এদিকে যথাযথ দৃষ্টি দেয়া সম্ভব হয়নি। তাই আগামী দিনে উপরে বর্ণিত উপসর্গগুলো দমনে সরকারের জিরো টলারেন্স নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে সর্বোচ্চ জন-প্রত্যাশা। আওয়ামী লীগকে ধন্যবাদ তারা তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এসব বিষয় শুধু সংযুক্তই করেননি, বরং অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এসব বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি রাখা হবে বলে উল্লেখ করেছেন।
নির্বাচন উপলক্ষে গত একমাসে হাজারো নিরপেক্ষ লোকের সঙ্গে আলাপ করেছি। দেশ শাসনে, উন্নয়নে, জঙ্গি দমনে, দারিদ্র্য বিমোচনে, সর্বোপরি জনকল্যাণে আওয়ামী লীগের বিকল্প তারা দেখছেন না। খাওয়া-দাওয়া, চলা-ফেরা, আয়-রোজগারে তারা সুখী। সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে তারা মহাখুশি। পদ্মাসেতু দক্ষিণাঞ্চলের চার কোটি মানুষকে ভাগ্য পরিবর্তনের হাতছানি দিচ্ছে। তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ। নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর-ফেনী-চট্টগ্রাম-সিলেট-কুমিল্লা-চাঁদপুরসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষ রাজধানীতে এসে অবাক— কোথায় গেল গুলিস্তান? সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ি? এক উড়াল সেতুতে সবকিছু হাওয়া। কুড়িল বিশ্বরোডে গেলে বাঙালি বাংলাদেশ দেখে না— দেখে সিঙ্গাপুর-ব্যাংকক। তিনতলা রাস্তা— আলোর ঝলকানি তাদের আরো উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখায়। শেষ মুহূর্তের ভোট-ভাবনায় ব্যাপক আলোড়ন তোলে।
n লেখক : সাবেক প্রধান তথ্য কর্মকর্তা