একটি পুরোনো গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। এক ধনী লোকের ছেলে আর গরিবের ছেলে একসঙ্গে লেখাপড়া করত। কিন্তু ধনীর ছেলেটি ঠিকমতো লেখাপড়া করত না, তাই পরীক্ষার পর দেখা গেল ধনীর ছেলে ফেল আর গরিবের ছেলে পাশ। এতে ধনী লোকটির মানসম্মান থাকে না। আরেক জন এই চান্সে ধনী ব্যক্তিটিকে একটু খোঁচানোর সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইল না। সে গরিব ব্যক্তির ছেলেটির পাশ করার রেফারেন্স দিয়ে বলে, শুনলাম অমুকের পোলায় বিরাট পাশ দিছে। ধনী ব্যক্তিটি জবাব দেয়, পাশ কইরা লাভ কী? চাকরি তো পাইব না। কিন্তু দেখা গেল ছেলেটি ভালো একটা চাকরি পেল। এখন আবার ঐ খোঁচানো স্বভাবের ব্যক্তিটি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ধনী লোকটি বলে, চাকরি পেলে লাভ হবে কী? বেতন তো পাইব না। কিন্তু দেখা গেল মাস শেষে ভালো বেতন পেল! এবার ঐ ধনী ব্যক্তিটির মুখ থেকে শোনা গেল :বেতন পাইলে কী হবে? ঐ টাকা কোনো কাজে লাগবে না! সুখ পাইব না!
উল্লিখিত গল্পটিতে বাংলাদেশের মানুষের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। আমাদের দেশে একশ্রেণির মানুষ আছে, যারা ভীষণ রকম সংশয়বাদী এবং যারা সবকিছুতেই একটা ‘কিন্তু’ খোঁজে। সবকিছুতে খুঁত ধরা বা সমালোচনা করাই তাদের স্বভাব।
আসলে একশ্রেণির মানুষই আছেন যারা, সকাল-সন্ধ্যা শুধু অন্যের সমালোচনা, অন্যের কাজের খুঁত ধরে বেড়ান। অবশ্য অন্যের নামে সমালোচনার এই বিষয়টি পৃথিবীর প্রায়খানেই দেখতে পাওয়া যায়। কমবেশি সবাই অন্যের সমালোচনা করতে পছন্দ করে থাকেন। সমালোচনার শিকার হয়ে অনেকেই আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন এবং মনের ভেতর জন্ম নেয় অজানা এক ধরনের ভয় ও লজ্জা। স্যার উইনস্টন চার্চিল সমালোচনার কষ্টকে ‘শারীরিক ব্যথার চেয়েও বেশি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু মানুষ তার পরও কেন অন্যের সমালোচনা করতে এত পছন্দ করেন তা এক রহস্য।
সমালোচনার ভালো-মন্দ দুটো দিকই আছে। সমালোচনা যেমন মানুষের ভুল শুধরে দেয় আবার অনেক সময় তা এমন পর্যায়ে চলে যায়, যা মানুষের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেয়। আমাদের প্রত্যেককেই সমাজে চলতে-ফিরতে নানা রকম সমালোচনা শুনতে বা করতে হয়। অনেক সময় দেখা যায়, সমালোচনা ব্যক্তিগত আক্রমণের পর্যায়ে চলে যায়। সমালোচনার ভাষা এমন থাকে, যা মোটেও যৌক্তিক নয়। আবার অনেক সময় কেউ কেউ শুধু কাউকে অপছন্দ করে বলে সে যা-ই করুক যা-ই লিখুক, যা-ই বলুক, সেটা নিয়ে সমালোচনা করে থাকে। ভালো-মন্দ কোনো কিছুই বিবেচনা করে না। আসলে এমন সমালোচনা করা কতটা উচিত?
ব্যক্তিকে নিয়ে আমরা সমালোচনা তো করি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সরকার, রাজনৈতিক দল নিয়েও আমরা প্রতিনিয়ত সমালোচনা করি। এই সমালোচনা অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্বেষমূলক হয়। আমাদের ব্যক্তিগত লাভালাভের সঙ্গে, পছন্দ-অপছন্দের সঙ্গে সমালোচনা বা বিদ্বেষনির্ভর করে।
আমাদের দেশের মানুষ সরকারের সমালোচনাতেও যথেষ্ট সিদ্ধহস্ত। দেখা যাচ্ছে, সরকার যা কিছু করছে, তাতেই একদল মানুষ সমালোচনা করছে। সরকার কিছু না করলেও সমালোচনা করছে। সমালোচনা চলছেই। করোনা ভাইরাস নিয়ে সরকারের ভূমিকার কথাই ধরা যাক। যখন চীনের উহানে প্রথম করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঘটল এবং বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা আটকা পড়ল, তখন সবাই সমালোচনা শুরু করল, কেন তাদের ফিরিয়ে আনা হচ্ছে না। সরকার অনেক দেনদরবার করে বিশেষ বিমানে করে দেশে এনে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে রাখলে কেউ কেউ সমালোচনা শুরু করে, এসব সরকারের বাড়াবাড়ি। প্রাথমিক পরীক্ষানিরীক্ষার পর ওদের ছেড়ে দিলেই হতো। এরপর সরকার বিদেশফেরতদের ব্যাপারে ক্রমশ কঠোর হওয়া শুরু করলে অনেকেই বলতে শুরু করেন, বাংলাদেশে ওসব নেই, হবেও না। সরকার শুধু শুধু ভীতি ছাড়াচ্ছে। এরপর করোনা ইতালিতে ভয়াবহ আকারে সংক্রমিত হওয়া শুরু করলে সেখান থেকে শত শত প্রবাসী দেশে ফেরা শুরু করে। আশকোনা হাজি ক্যাম্পে তাদের কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করলে তারা খেপে যান। তারা নিজগৃহে কোয়ারেন্টাইনে থাকার জন্য জেদ ধরেন। ইতালিফেরত কয়েক শ মানুষের ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষের মুখে সরকার তাদের বাড়ি যাবার অনুমতি দেন। বাসায় ফেরার আগে অবশ্য তারা হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার অঙ্গীকার করেন। এ নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক সমালোচনা। কেন তাদের দেশে আসার অনুমতি দেওয়া হলো, দেশে যদিও আসার সুযোগ দেওয়া হলো তো কেন তাদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে রাখা হলো না—এ নিয়ে বয়ে যায় সমালোচনার ঝড়। সরকার যদি কঠোর হয়, তাহলে করা হয় তীব্র সমালোচনা, আর নরম হলে বলা হয়, দায়িত্বজ্ঞানহীন, উদাসীন। সরকার যে উদ্যোগই নেয় সঙ্গে সঙ্গে সমালোচনা শুরু হয়ে যায়—এটা এভাবে কেন, এভাবে নয় কেন। আবার কোনো উদ্যোগ না নিলেও অথর্ব, অকর্মণ্য বলে গালি দেওয়া হয়।
আমেরিকান লেখক, দার্শনিক এলবার্ট হাবার্ডের একটা বিখ্যাত উক্তি আছে :সমালোচনা এড়াতে চাইলে কিছু কোরো না, বোলো না, হইয়ো না। যার জীবনে কোনো অর্জন নেই, যে পৃথিবী ধ্বংস হলো কী গড়ল এটা নিয়ে মাথা ঘামায় না তাকে নিয়ে কেউ সমালোচনা করার তেমন কিছু খুঁজে পায় না। যখনই আপনি কিছু করতে যাবেন, কিছু একটা বলতে যাবেন, কিছু একটা হতে যাবেন, পৃথিবী দুই ভাগ হয়ে যাবে। একদল আপনাকে প্রশংসা করবে, আপনি আরো এগিয়ে যান সেই কামনা করবে, আর আরেক দল আপনার মুণ্ডপাত করবে।
সমাজে অনেক মেধাবী ও গুণী মানুষ আছেন যারা শুধু উটকো সমালোচনার ভয়ে নিজের নিরাপদ বলয়ের বাইরে বের হন না। ‘কী দরকার ঝামেলা বাড়িয়ে, ভালোই তো আছি’—এটা হচ্ছে তাদের চিন্তা। তাদের দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই। যোগাযোগ মাধ্যমের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সমালোচনার বারুদও অনেক তাড়াতাড়ি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আপনি হয়তো কোনো গ্রামের ছেলেমেয়েদের জন্য একটা স্কুল করে দিলেন। দুটি পত্রিকায় আপনাকে নিয়ে বিশাল প্রশংসাসূচক লেখা ছাপা হতে না-হতেই অন্য তিনটা পত্রিকায় আপনার নামে যাবতীয় কুত্সা ছড়ানো হবে। পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী, করপোরেট শক্তির ইন্ধনে আপনি যে স্কুলের নাম করে তলে তলে ‘বিশাল ষড়যন্ত্র’ করে বসে আছেন সেটা নিয়ে অনেক কেচ্ছাকাহিনি ছাপানো হবে। অথচ আপনি শুধু ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার একটা ব্যবস্থা করতে চেয়েছেন, এই যা।
আমাদের দেশে এটা প্রচলিত আছে যে, এখানে একজন মানুষের ক্ষতি করা অনেক সহজ কিন্তু কারো উপকার করা অনেক ঝামেলার ব্যাপার। আমরা বাংলাদেশের মানুষরা চারদিকের নেগেটিভ জিনিসে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে এখন আর মানুষের ভালোত্বে বিশ্বাস করি না সহজে। কেউ যে বিনা কারণে ভালো হতে পারে, স্বার্থহীন হতে পারে এটা বিশ্বাস করতে আমাদের কষ্ট হয়। আমরা কেন উন্নত হতে পারছি না? আমাদের কেন মনে হয় চারদিকের সবাই খারাপ, সবাই ষড়যন্ত্রকারী, চক্রান্তকারী? যেসব মানুষের নিজের ওপর শ্রদ্ধা কম তারা বেশি কুসংস্কারে ভোগে। সমালোচনায় মুখর হয়। অর্থাত্ যেসব মানুষ আসলে নিজের যোগ্যতা নিয়ে খুশি নয়, নিজের ওপর নিজের খুব বেশি শ্রদ্ধা নেই, আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগে, তারা সাধারণত মানুষকে নিয়ে বেশি নেগেটিভ কথা বলে। অন্যের ভালো কিছু দেখলে তারা সহজে খুশি হতে পারে না, তাদের প্রথম চিন্তাটি হয় নেগেটিভ। মানুষকে সহজে বিশ্বাস করতে পারে না তারা।
যারা সমালোচনার ভয়ে বসে না থেকে নিজের মনের কথা বলে ফেলে, দেশের জন্য কিছু একটা করার চেষ্টা করে, নিজে কিছু একটা হতে চেষ্টা করে তাদের নিয়ে প্রয়াত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট একটা যুগান্তকারী কথা বলেছিলেন :‘যারা সমালোচনা করছে তারা গুরুত্বপূর্ণ নয়। যারা আঙুল উঁচু করে দেখিয়ে দিচ্ছে শক্ত মানুষটি কীভাবে হোঁচট খাচ্ছে তারাও গুরুত্বপূর্ণ নয়। যারা বাইরে থেকে উপদেশ দিয়ে বেড়াচ্ছেন কীভাবে কাজটা আরো ভালোভাবে করা যেত তারা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সব কৃতিত্ব হচ্ছে তার, যিনি আসলে সত্যিকার মাঠে নেমে যুদ্ধ করছেন। যার মুখ ও দেহ ধুলো, ঘামে ও রক্তে রঞ্জিত। যিনি জীবন দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। যিনি বারবার ভুল করছেন এবং জয়ের একেবারে শেষ মাথায় এসে পৌঁছাচ্ছেন। যিনি চরম উত্সাহ, আগ্রহ, সাধনা নিয়ে নিজেকে একটা অর্থপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করেছেন। যিনি বিজয়ী হওয়ার কৃতিত্বের কথা জানেন কিংবা যদি জয়ী হতে নাও পারেন, অন্ততপক্ষে বীরের মতো চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। অতএব, তার স্থান কখনোই সেসব ভীরু ও দুর্বল মানুষের সঙ্গে হবে না, যারা জয় কিংবা পরাজয় কোনোটার স্বাদ কখনো পায়নি।’
সমালোচনা আমরা অবশ্যই করব, কিন্তু শুধু শুধু সমালোচনা করে বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করে আমরা কারো সত্ ও আন্তরিক উদ্যোগে যেন বাগড়া না দিই! নিজে কিছু করতে না পারি, না-ই করলাম, কিন্তু যে কিছু একটা করছে, খামোখা কেন তার পথকে কণ্টকিত করব?
তার পরও সমালোচনা করতে কেউ ছাড়ে না। আমাদের গ্রামে একটি প্রচলিত গল্প আছে কলা আর লেবুকে নিয়ে। কলা বলছে লেবুকে, তোকে লোকে চিপে খায়! তাত্ক্ষণিক লেবুর জবাব, তোকে যে সবাই ছাল ছাড়িয়ে খায়।
n লেখক :রম্যরচয়িতা