২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যুক্ত হতে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানির বড় বাজার ইউরোপের দেশগুলোতে জিএসপি’র আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে জিএসপি প্লাসের আওতায় এ সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এসব শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে দেশগুলোতে বাংলাদেশকে আট থেকে ৯ শতাংশ হারে শুল্ক পরিশোধ করতে হতে পারে। ফলে ইইউভুক্ত ২৭টি দেশে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি সাড়ে ৯ শতাংশ হারে কমতে পারে। আর্থিক মূল্যে যার পরিমাণ বছরে অন্তত ১৬০ কোটি মার্কিন ডলার। পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানীতে পিআরআই কার্যালয়ে এক সেমিনারে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তারের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম। ‘স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ এবং ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাক পণ্য রপ্তানি’ শীর্ষক ওই সেমিনারে অর্থনীতিবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকরা উপস্থিত ছিলেন।
গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে পিআরআই’র গবেষণা পরিচালক ড. আব্দুর রাজ্জাক ইউরোপের বর্তমান পোশাকের বাজার, বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যের অংশ, প্রতিযোগী অন্যান্য দেশের অবস্থা, বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। এ সময় তিনি বলেন,বাংলাদেশের রপ্তানির সম্ভাব্য পতনের ফলে অন্যান্য দেশ লাভবান হবে। বিশেষত চীন বড় সুবিধা নেবে। এছাড়া কম্বোডিয়া, ভারত, তুরস্ক এবং ভিয়েতনামও লাভবান হবে।
অবশ্য এ জিএসপির বিদ্যমান সুবিধার মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, জিএসপি প্লাস সুবিধার জন্য বিকল্প কৌশল নির্ধারণ, ইউরোপের সঙ্গে আলোচনা করে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করা, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে পোশাকের বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনের উন্নয়ন, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, গার্মেন্টস খাতের কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, অবকাঠামো সুবিধা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম সহজ করার উপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তবে প্রতিবেদনের এমন বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত নন দেশের অন্যতম বড় পোশাক রপ্তানিকারক ও তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সাবেক সভাপতি ফজলুল হক। আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। বরং বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে দর কষাকষিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা ও পণ্যের মানোন্নয়ন করতে পারলে বাংলাদেশ এ ধরনের যে কোনো সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, দরাদরির দক্ষতায় পিছিয়ে থাকায় অন্তত ৫ শতাংশ দর হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা, যা ক্রেতার পকেটে চলে যাচ্ছে। আমরা ক্রেতাকে ‘না’ বলতে ভয় পাই। কেননা একজন একটি অর্ডার ছেড়ে দিলেই অন্যজন কম দরেই তা নিয়ে নিচ্ছেন। অবশ্য এর থেকে আশু কোনো সমাধানও দেখছেন না তিনি।
এ সময় বক্তারা ইউরোপের বাজারে জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে শ্রমিক মালিক সম্পর্কে জোর দেওয়ার তাগিদ দেন। মোহাম্মদী গ্রুপের প্রধান রুবানা হক বলেন, শ্রম অধিকার ইস্যুতে আন্তর্জাতিক খোলোয়াড়রা সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। এ ইস্যুতে সব সময় আমাদের চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা করে। জিএসপি প্লাসের জন্য গতানুগতিক শর্ত পূরণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কূটনীতিতে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শ্রম ইস্যুতে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষক ড. মোস্তফা আবিদ খান। সব ক্ষেত্রেই এই ইস্যুটির মুখোমুখি হতে হয়।
ড. শামসুল আলম বলেন, এর আগে কোটা ব্যবস্থা উঠে যাওয়ার সময়ও বাংলাদেশের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করা হয়েছিল। বাস্তবে তা হয়নি। ইউরোপে জিএসপি সুবিধা না থাকলেও বাংলাদেশের রপ্তানিতে বড় ধরনের ক্ষতি হবে না। কেননা উদ্যোক্তারা সেই সক্ষমতা ইতোমধ্যে তৈরি করেছেন।
সেমিনারে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ নাছির, আইএলও’র সাবেক উপদেষ্টা ড. রিজওয়ানুল হক প্রমুখ।