বিএনপি দীর্ঘকাল ধরে আবেদন-নিবেদন, হইচই, হুমকি প্রদর্শন দ্বারা যে কাজটি করতে পারেনি, করোনা ভাইরাস সে কাজটি অতি সহজে করে দিয়েছে। খালেদা জিয়া জামিনে ছয় মাসের জন্য জেল থেকে মুক্ত হয়েছেন। আমি ইতিপূর্বে ঢাকার আরেকটি দৈনিকে নিজের এই ধারণার কথা লিখেছি, খালেদা জিয়াকে মহামান্য আদালত জামিনে মুক্তি দিয়েছেন, হয়তো করোনা ভাইরাসের কথা বিবেচনা করে। জেলের বন্দি পরিবেশে বেগম জিয়া সহজেই এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হতে পারেন, আদালত সম্ভবত এটাই বিবেচনা করেছেন।
সরকারি ও বিরোধী দল দুই পক্ষের জন্যই এটা সুবিধাজনক হলো। জেল থেকে বেরোনোর পর বেগম জিয়া যদি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হন (যেন না হন, সেই প্রার্থনাই করি), তাহলে সেই দায়িত্ব তার নিজের, তার পরিবারের, তার দলের। কোনো কিছু হলেই বিএনপির চ্যাঁচামেচি করার যে স্বভাব, তাতে জেলে বন্দি খালেদা জিয়ার করোনা রোগ হলে বিএনপি আওয়ামী লীগ সরকারকে দায়ী করে যে চ্যাঁচামেচি করত, তাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিনের কাজ, রাতের বিশ্রাম হারাম হয়ে যেত। বিএনপিকে এখন এই চ্যাঁচামেচি করতে হবে না।
এখন খালেদা জিয়া জেলমুক্ত হওয়ায় আওয়ামী লীগ হয়তো আশা করতে পারে, দুই দলের মধ্যে একটা গুডউইল সাময়িকভাবে হলেও সৃষ্টি হবে এবং মানবতার সবচাইতে বড়ো শত্রুর হামলায় সারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশ যখন বিপর্যস্ত, তখন এজাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলায় দুটি বড়ো দলের কর্মীরা একযোগে মাঠে নামবেন এবং দুর্গত জনগণের পাশে দাঁড়াবেন। বিএনপি যদি বুদ্ধির পরিচয় দেয়, তাহলে এই সুযোগ গ্রহণ করবে এবং জনগণের পাশে দাঁড়াবে। আর অদূরদর্শী ও অবিবেচক হলে জাতীয় রাজনীতিতে আরো ব্রাত্য হয়ে পড়বে।
বর্তমান পরিস্থিতি বিএনপির জন্য সত্যিই হারানো জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারের একটা সুযোগ এনে দিয়েছে। এজাতীয় দুর্যোগে তারা যদি জনগণের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় এবং আওয়ামী লীগের কর্মীদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করে, তাহলে জনগণের আস্থা লাভে তারা দ্রুত সক্ষম হবে। আর আওয়ামী লীগ সরকার যদি ক্ষমতার অহংকারে জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় বিরোধী দলগুলোর সহযোগিতা না চায় অথবা বিরোধী দল সহযোগিতা দিতে চাইলেও তা না নেয়, তাহলে সেটা হবে তাদের বোকামি।
ব্রিটিশ আমলে পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষের সময় দেখেছি, আনাহারী মানুষের জন্য ব্রিটিশ সরকার সারা দেশে লঙ্গরখানা খুলেছে। সেগুলো প্রয়োজন মেটাতে পারেনি। ফলে তত্কালীন কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি পরস্পরের বিরোধী দল হলেও তারাও অনাহারী মানুষের জন্য লঙ্গরখানা খুলেছে। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ পরস্পরের ভয়ানক শত্রু হলেও একযোগে লঙ্গরখানা খুলে অনাহারী মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিয়েছে। পাকিস্তান আমলে উনসত্তরের ভয়াবহ নভেম্বর-সাইক্লোনের সময় (এক রাতে ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল) বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি, সরকারি সাহায্যের দাবি জানিয়ে বসে না থেকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দুর্গতদের মধ্যে কাপড়, জামা, খাদ্যদ্রব্য, ওষুধপত্র বিতরণের জন্য ছুটে যেতে।
পাকিস্তান আমলে আবু হোসেন সরকার যখন তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী, তখন খাদ্য ঘাটতির কারণে দুুর্ভিক্ষাবস্থা দেখা দিয়েছিল। তখন বঙ্গবন্ধু খাদ্যের দাবিতে আন্দোলনে নামা সত্ত্বেও নিজে খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করে অধিকতর দুর্গত এলাকায় গিয়েছিলেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও এটা ঘটেছে। ১৯৬৯ সালের জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের কথা বলেছি। ১৯৪২ সালে ভয়াবহ সাইক্লোনের পর দেখেছি তত্কালীন রাজনৈতিক দল কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, খাকসার, আহরার প্রভৃতিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ত্রাণকার্যে নামতে।
ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত সব রাজনৈতিক দলকে রাজনীতি করার পাশাপাশি জনগণকে নানা ধরনের সোশ্যাল সার্ভিস দিতে দেখেছি। কোনো এলাকায় কলেরা, বসন্ত মহামারি আকারে দেখা দিলে রাজনৈতিক দলগুলো সরকারি সাহায্যের অপেক্ষায় হাত গুটিয়ে বসে থাকত না। নিজেরাও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করে নিজেদের সাধ্যমতো ওষুধপত্র সংগ্রহণ করে উপদ্রুত এলাকায় ত্রাণকার্যে নামত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর এই সামাজিক সেবাদানের ট্র্যাডিশন প্রায় উঠে গেছে। আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ নামে একটি সংগঠন আছে। বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন আর বড়ো নেতাদের খায়খেদমত করা ছাড়া কোনো জাতীয় দুর্যোগে তাদের কোনো বড়ো ভূমিকা ছিল কি না, তা আমি জানি না।
স্মরণকালের পৃথিবীতে অনেক ধ্বংস ও মহামারি এসেছে। নুহের মহাপ্লাবনের কথাও আমরা জানি। কিন্তু কোনো এক এলাকা বা দেশের মধ্যে এই বিপদ সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এই ভাইরাস গোটা মানবসভ্যতার জন্য ভয়াবহ বিপদ হিসেবে ছড়িয়েছে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এর কোনো প্রতিষেধক নেই। উন্নত, অনুন্নত সব দেশে সরকার লকডাউন ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। রাস্তাঘাটে চলাচল, যানবাহনে চলাচল সব বন্ধ। সবাই থাকছে আইসোলেসশনে। ইতালিতে অনেক স্বামী-স্ত্রী পর্যন্ত এক ঘরে না থেকে আইসোলেশনে থাকছে। দেশে দেশে হ্যান্ডসেক ও আলিঙ্গন পর্যন্ত নিষিদ্ধ। বিমানে, ট্রেনে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ প্রায় বন্ধ। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এত বড়ো বিপর্যয় আগে কখনো আসেনি।
বিশ্বের পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে জাতিসংঘের মহাসচিব বৃহত্ শক্তিগুলোর কাছে আবেদন জানিয়েছেন, তারা যেন যুদ্ধ বন্ধ রাখে এবং সংঘবদ্ধ হয়ে ভাইরাসরূপী মানবতার এই মহাশত্রুকে দমনের কাজে নামে। এটা গোটা মানবসমাজের কমন এনেমি। বড়ো ও উন্নত দেশগুলোর সম্ভাব্য যুদ্ধ স্থগিত রাখার মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ছোটো-বড়ো রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত দলীয় রাজনীতি আপাতত স্থগিত রেখে ঐক্যবদ্ধভাবে আতঙ্কিত জনগণের পাশে দাঁড়ানো। বর্তমান সমস্যায় জনগণকে খাদ্য, ওষুধপত্র বা নগদ অর্থ দিয়ে সাহায্য জুগিয়ে লাভ হবে না। এসব সাহায্য পরে দরকার হবে। এই মুহূর্তে দরকার গৃহবন্দি জনগণকে আশ্বাস, সাহস ও উত্সাহ জোগানো। জনগণের মন থেকে আতঙ্ক দূর করা।
এই ভাইরাসের বিস্তার এবং তার আতঙ্ক কতদিনে দূর হবে জানি না। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পরপরই বিশ্বে আসবে ত্রিশের মন্দার চাইতেও ভায়াবহ মন্দা। এই মন্দা ক্যাপিটালিস্ট-সোশ্যালিস্ট সমাজের ভেদ ঘুচিয়ে দেবে। জাতিতে জাতিতে যুদ্ধ থামিয়ে দেবে। অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আমেরিকাকে চীনের সাহায্য চাইতে হবে। এই ভাইরাস ঠেকানোর জন্য কমিউনিস্ট চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার বিজ্ঞানীরা একযোগে কাজ করবেন। ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা বাঘ ও গরুকে এক ঘাটে পানি খাওয়াবে। ২০০৮ সালের মন্দার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্টকে পর্যন্ত সোশ্যালিস্ট প্রেসক্রিপশন নিয়ে ক্যাপিটালিজমকে বাঁচাতে হয়েছিল। এবার তার চেয়েও ব্যাপাকভাবে সোশ্যালিজমের প্রেসক্রিপশন নিয়ে ক্যাপিটালিজম বাঁচার চেষ্টা করবে।
এটা তো অর্থনীতির বিশেষজ্ঞদের ভবিষ্যদ্বাণী। অনেক সমাজবিজ্ঞানী বলছেন, করোনা-উত্তর পৃথিবীতে পুরোনো সমাজকাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে এবং নতুন ধরনের বিন্যাস নিয়ে সমাজ গঠিত হবে। সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসও হবে তদনুরূপ। অর্থনির্ভর বর্তমান শ্রেণিবিন্যাস থাকবে না। করোনা ভাইরাস যেমন ব্রিটেনের প্রিন্সকে এবং ইতালির ১০ জন পপারকে আক্রমণ করতে কোনো ভেদাভেদ করেনি, তেমনি ভবিষ্যতের সমাজ নির্মাণেও এই ভেদাভেদ আরো ঘুচিয়ে সামন্ত যুগের মতো পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল সহযোগী শ্রেণি গড়ে তোলায় মানবসমাজকে বাধ্য করবে। কোনো কোনো সমাজবিজ্ঞানীর মতে, করোনা ভাইরাসের বিশ্বব্যাপী “এগ্রেসন” থেকে মানবসভ্যতা কষ্টেসৃষ্টে বাঁচার পর এর ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে এক নতুন ধরনের শ্রেণিবিন্যাসসহ নতুন ধরনের সমাজ গঠিত হবে। এটাই হবে করোনা ভাইরাসের দিগ্বিজয়ের পরবর্তী ভালো ও মন্দ দিক। মহাপ্লাবনের ধ্বংসযজ্ঞের পর যেমন তার গলিতে নতুন জনপদ গড়ে ওঠে, তেমনি এবারের করোনাও হবে ধ্বংস ও সৃষ্টির এক নয়া উদাহরণ।
এই মহাধ্বংসের হাত দেশে দেশে রাজনীতির চেহারা পালটাবে। বাংলাদেশের রাজনীতিও অবশ্যই পালটে যাবে। আওয়ামী লীগ তিন তিনবার ক্ষমতায় থাকতে পারায় যে আত্মসন্তোষের দুর্গে বাস করছিল, সেই দুর্গ ভেঙে যাবে। দেশের রাজনীতিতে করোনা-পরবর্তী যে বিশাল পরিবর্তন ঘটবে, সেই দূর ভবিষত্ পর্যন্ত আমার অনুমান যাবে না বা যাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু আশু বা অদূর ভবিষ্যতের পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে কিছুটা অনুমান করতে পারি। আওয়ামী লীগ সরকারের আত্মসন্তোষের দুর্গ যে ভাঙবে, সে কথা আগেই বলেছি। শেখ হাসিনা আগের ক্রাইসিসগুলোর মতো এবারের মহাক্রাইসিসকেও সাহস ও দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করবেন। কিন্তু তিনি আজ হোক কাল হোক, মন্ত্রিসভায় বড়ো ধরনের রদবদল ঘটাতে বাধ্য হবেন।
এবার শেখ হাসিনা পরীক্ষামূলকভাবে তার মন্ত্রিসভায় অধিকাংশ পুরোনো মুখ বাদ দিয়ে বলতে গেলে সম্পূর্ণ নতুন মুখ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছেন। এদের অনেকেই অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা প্রদর্শনে সক্ষম হননি। উদাহরণ হিসেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কথা বলা যায়। মন্ত্রী পরিবর্তনে এই মন্ত্রকের পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি কমেনি। বর্তমানে আরো বেড়েছে। গত ডেঙ্গু মহামারি এবং বর্তমান করোনা বিভীষিকার মধ্যেও দেখা গেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রক পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের সীমাবদ্ধ সক্ষমতারও পরিচয় দিতে পারেনি। একই সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়সহ আরো কয়েকটি মন্ত্রকের ব্যর্থতার ইতিহাস টানা যায়, কিন্তু এখানে তার বিষদ আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক।
প্রধানমন্ত্রী যে সাহস ও দক্ষতা নিয়ে দেশের অর্থনীতির উন্নতির চাকা ঘোরাচ্ছেন, তার অধিকাংশ মন্ত্রী সেই চাকার গতি ধরে রাখতে অক্ষম। এই ভাইরাস অ্যাটাক এবং তদপরবর্তী যে ভয়াবহ মন্দা বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশকেও আঘাত করবে, তা মোকাবিলার জন্য শেখ হাসিনা আগাম পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন, কিন্তু তার বর্তমান অধিকাংশ মন্ত্রী দ্বারা এর বাস্তবায়ন সম্ভব কি? তাকে ট্যালেন্টেড নতুন মুখ অবশ্যই খুঁজতে হবে এবং পুরোনো মুখদের কাউকে না কাউকে মন্ত্রিসভায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভায় রদবদল অনিবার্য।
আমার বিশ্বাস, শেখ হাসিনা যদি একটি দক্ষ মন্ত্রিসভা ও সংগঠিত দলের সহযোগিতা পান, তাহলে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন। এটা এই শতকের গোড়ার অর্থনৈতিক মন্দার সময়েও দেখা গেছে। তখনকার মন্দার আঘাতে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই দুর্যোগ দেখা দিয়েছে। কিন্তু হাসিনা সেই দুর্যোগকে বাংলাদেশে ঢুকতে দেননি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে তেলের সংকট দেখা দেওয়ার সময়ও শেখ হাসিনা তার ধাক্কা সাহস ও সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন। এর কারণ বাংলাদেশে তার সরকারের আমলে যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে, তার ভিত্তি নড়বড়ে নয়।
সম্প্রতি প্রথম আলোয় অর্থনীতিবিদ ড. রওনক জাহানের একটি সাক্ষাত্কার বের হয়েছে। তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বর্তমান সরকারের সমালোচনা করতে চেয়েছেন। তা ভালো, কিন্তু তার একটি বক্তব্য বাস্তবতাসম্মত নয়। তিনি বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক উন্নতি বলতে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার এখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর অনেক বেশি জোর দিচ্ছে। তারা অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুত্ ও জ্বালানি সুবিধার উন্নয়নে জোর দিচ্ছে।... আমাদের অনেক টাকাপয়সা হচ্ছে, এটাই তো একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না।’ রওনক জাহান অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নাম টেনে এনে হাসিনা সরকার যে ধনবৈষম্য দূরীকরণের অর্থনীতি অনুসরণ করছে না, এটাও বলতে চেয়েছেন।
বঙ্গবন্ধুর জন্য মায়াকান্না কেঁদে হাসিনা-সরকার যে নীতিভ্রষ্ট হয়েছে, এ কথা প্রমাণ করাই ড. রওনক জাহানের লক্ষ্য এবং সেজন্যই প্রথম আলো তার বক্তব্য লুফে নিয়েছে। ড. রওনক জাহান, রেহমান সোবহান, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য প্রমুখ মূলত গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের এজেন্ট। এরা যখন ধনবৈষম্য বিলোপের নামে, সুষম অর্থনীতি ও সুশাসনের নামে মায়াকান্না কাঁদেন, তখন এদের জন্য কৃপা হয়। এটা এখন সবারই জানা, বিশ্বে এখন আপাতত হলেও সমাজতন্ত্র ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি পরিত্যক্ত। এই অর্থনীতি প্রবর্তন করতে গিয়েই বঙ্গবন্ধুকে প্রাণ দিতে হয়েছে। এই অর্থনীতি প্রবর্তনের সময়েই রেহমান সোবহানের দল নানা অছিলায় বঙ্গবন্ধুকে ত্যাগ করে অক্সফোর্ডে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখন তাদেরই একজন বঙ্গবন্ধুর অর্থনীতি নিয়ে মায়াকান্না কাঁদছেন।
সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ও সমাজতন্দ্রের বিপর্যয় ও গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের একক বিজয় লাভের পর চীন, কিউবাসহ কমিউনিস্ট দেশগুলো ধনবাদী অর্থনীতি গ্রহণে বাধ্য হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের পক্ষে এককভাবে বঙ্গবন্ধুর সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি অনুসরণ করা সম্ভব ছিল কি? বর্তমানেও তা কি সম্ভব? শেখ হাসিনা বর্তমান ধনবাদী অর্থনীতি তার পূর্বতন স্বৈরাচার সরকারগুলো থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। এর রাতারাতি পরিবর্তন চাইলে শেখ হাসিনাকে বহুদিন আগে বঙ্গবন্ধুর পরিণতি বরণ করতে হতো।
শেখ হাসিনা সে পথে যাননি। তিনি বঙ্গবন্ধুর মৌলিক ও প্রধান আদর্শ অসাম্প্রদায়িকতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে শক্তভাবে ধরে রেখে ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির পথেই দেশকে উন্নয়নের দিকে টেনে নিয়েছেন। ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির অঙ্গাঙ্গি সহযোগী দুর্নীতি। এই দুর্নীতি স্বাভাবিক কারণেই হাসিনা সরকার এখনো দূর করতে না পারলেও অনেক অর্থনীতিবিদের মতেই এই দুর্নীতিকে যতটা সম্ভব গঠনমূলকভাবে ব্যবহার করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। তাদের আগেকার সামরিক ও বিএনপি সরকার ধনবাদী অর্থনীতির দুর্নীতি দ্বারা শহরভিত্তিক একটি লুটেরা নব্য ধনিক শ্রেণি গঠন করেছে, যাদের প্রধান কাজগুলোর মধ্যে একটি—বিদেশে টাকা পাচার।
আওয়ামী লীগ আমলে পল্লিকেন্দ্রিক বিত্তবান শ্রেণি পাশাপাশি তৈরি হয়েছে। যারা অন্যান্য দোষে দোষী হলেও বিদেশে টাকা পাচার করে না, বরং তা গ্রামীণ অর্থনীতির অবকাঠামোগত উন্নয়নেও ব্যবহূত হয়। এটা বর্তমান সরকারের জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটা শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। আমি অর্থনীতিবিদ নই, কিন্তু বেশ কয়েক জন দেশি-বিদেশি অর্থনীতিবিদের আলোচনা পাঠ করেই এই মত গ্রহণ করেছি। এজন্যই আমার আশা, বর্তমান করোনা-ক্রাইসিস এবং তত্পরবর্তী মহা অর্থনৈতিক মন্দার ধাক্কা অনেক উন্নত দেশও সামাল দিতে না পারলেও শেখ হাসিনা যদি যোগ্য সহকর্মীদের সহযোগিতা পান, তাহলে তা হয়তো কিছুটা সামাল দিতে পারবেন। তবে এবারের ক্রাইসিস আওয়ামী লীগের আত্মসন্তোষ ভাঙবে এবং এই সংকট আওয়ামী লীগ ও তার সরকারের ভবিষ্যত্ও নির্ধারণ করবে।
আমার ধারণা, বেগম জিয়ার জামিনে মুক্তি লাভের ফলে বিএনপির হাতে তার মুক্তি দাবি করার যে একটি ইস্যু ছিল তা-ও গেল। করোনা-সংকট বেগম জিয়াকে করুণা করেছে, কিন্তু তার দলকে আরো অস্তিত্বহীনতার পথে ঠেলে দিতে পারে। তার বাঁচার একমাত্র পথ এই মহাদুর্যোগে ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণ করা এবং জনগণকে সেবাদানের মনোভাব নিয়ে তাদের পাশে এসে দাঁড়ানো।
এই ক্রাইসিস যদি মানবসভ্যতা পেরোয় এবং বাংলাদেশও পেরোতে পারে, তাহলে একটি ভবিষ্যদ্বাণী অন্তত বিনা দ্বিধায় করা চলে—ড. কামাল হোসেন, ডা. বদরুদ্দোজা, কর্নেল অলি, কাদের সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব প্রমুখ রাজনীতির বৈতালিকগণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের ভাঙা ঢোল বাজানোর আর সুযোগ পাবেন না। তারা কালের বিস্মৃতির গর্ভে আশ্রয় পাবেন।
[ লন্ডন, ২৬ মার্চ, বৃহস্পতিবার, ২০২০ ]