রাজশাহী মহানগরীতে সুনসান নীরবতা

করোনা ভাইরাস সতর্কতার প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে বিভাগীয় শহর রাজশাহী। করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সরকারি নির্দেশে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মানুষকে ঘর থেকে প্রয়োজন ছাড়া বের না হতে উত্সাহিত করছে। করোনা আতঙ্কে সচেতন মানুষ বাইরে বের হচ্ছে না। তাই সারাদেশের ন্যায় রাজশাহী মহানগরীতে নেমে এসেছে শুনসান নীরবতা। কিন্তু করোনা ভাইরাস আতঙ্ক যাদের স্পর্শ করতে পারেনি, সেই মানুষগুলো পরিবারের সদস্যদের পেটের তাগিদে দিনমজুর ও শ্রমিকরা সকাল হলেই নির্ধারিত স্থানে কাজের জন্য অপেক্ষা করছেন। এসব শ্রমিকরা টেলিভিশনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে করোনা ভাইরাস এর ভয়াবহতা সম্পর্কে জানলেও খুব পাত্তা দিচ্ছেন না। কারণ বাড়িতে বসে থাকলে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের অনাহারে থাকতে হবে। অবশ্য রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন নগরীর নিম্নআয়ের ২০ হাজার পরিবারকে ৩০টি ওয়ার্ড কাউন্সিলরের মাধ্যমে খাদ্য সামগ্রী হিসেবে ১০ কেজি করে চাল ও ৫০০ গ্রাম ডাল দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্যোগে কিছু সহায়তা দেওয়ার কথা শোনা গেছে। তবে সেটি নিম্নআয়ের মানুষের জনসংখ্যার তুলনায় অপ্রতুল বলে জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশ করোনা ভাইরাস সংক্রমণ থেকে মানুষকে রক্ষা করতে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তার অংশ হিসেবে বিভাগীয় শহর রাজশাহী থেকে সকলপ্রকার বাস ও ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর আগেই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে পড়েছে গোটা শহর। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছে দিনমজুর ও শ্রমিকরা। অথচ কয়েকদিন আগেও কাজ করে পেটের ক্ষুধা মিটিয়েছেন তারা। কিন্তু এখন কাজ না পেয়ে দিনমজুর ও শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছে। কাজ পাবে না জেনেও ঐসব দিনমজুর ও শ্রমিকরা সকালবেলা কাজের সন্ধানে ঠিকই বের হচ্ছেন। অপেক্ষা করছেন নগরীর শহিদ কামারুজ্জামান চত্বর (রেলগেট), ভদ্রা স্মৃতি অম্লান ও কোর্ট স্টেশন মোড়সহ বিভিন্ন পয়েন্টে। যারা কাজ করিয়ে নেন তারা এসব স্থানে গিয়ে পছন্দমত শ্রমিকদের মজুরি ঠিক করে নিয়ে যান। নির্দিষ্ট একটি সময়ে কাজ করে যা পান তা দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে চাল-ডালসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে নিয়ে যান। কিন্তু এতোদিনের এই নিয়ম বদলে গেছে করোনা প্রভাবে। দিনমজুর ও শ্রমিকরা আর কাজ পাচ্ছেন না। কাজ না পেলেও তারা নিয়মিত কাজের সন্ধানে বের হয়ে বসে বসে অপেক্ষা করছেন। রবিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত এমনি দৃশ্য দেখা গেছে নগরীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট শহিদ কামারুজ্জামান চত্বর (রেলগেট) এলাকায়। আগের দিন শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় কাজের সন্ধানে আসা কয়েকজন শ্রমিককে সেখানে বসে থাকতে দেখা যায়। তবে তারাও করোনা বিষয়ে সতর্ক, তাই কেউ মাস্ক পরতে ভুলেননি। সংক্রমণ থেকে বাঁচতে এসব শ্রমিকগণ মাস্ক পরে বসে রয়েছেন। এদিন সকাল থেকে ২-৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাজ পাননি তারা।

ভুক্তভোগী দিনমজুর ও শ্রমিকরা জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ তারা কম কাজ পেলেও গত কয়েকদিন থেকে কোনো কাজ পাচ্ছেন না। কাজ না থাকায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একরকম অভুক্ত দিনপার করছেন। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক বলেন, করোনা ভাইরাস নিয়ে সতর্ক থাকার জন্য লিফলেট ও মাস্ক ফ্রি পেয়েছেন। কিন্তু মাস্ক পড়ে বসে থাকলে তো পেটের ক্ষুধা মিটবে না। আরেক শ্রমিক বলেন, আমরা অর্থ কিংবা সাহায্য চাই না, কাজ চাই। যদি কাজ পাই, তাই বসে আছি। একই চিত্র দেখা যায় নগরীর ভদ্রা স্মৃতি অম্লান ও কোর্ট স্টেশন মোড়সহ বিভিন্ন পয়েন্টে। মহানগর ছাড়াও জেলার নয়টি উপজেলায়ও করোনা ভাইরাসের প্রভাবে দিনমজুর শ্রমিকরা বেকার সময় পার করছেন।

এদিকে করোনা ভাইরাসের সতর্কতায় কর্মহীন জেলার ৪০ হাজার ৪০০ নিম্ন আয়ের পরিবারকে চাল ও নগদ অর্থ সহায়তা দিচ্ছে জেলা প্রশাসন। এজন্য ৪০৪ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। নগরীর থানা এবং প্রতিটি উপজেলায় বরাদ্দ ৫০ হাজার করে টাকা।

জেলা প্রশাসক হামিদুল হক জানান, নগরীর ৬ হাজার পরিবারকে ৬০ মেট্রিক টন চাল দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা প্রতি বরাদ্দ যথাক্রমে গোদাগাড়ী ৪ হাজার ৪০০ পরিবারের জন্য ৪৪ মেট্রিক টন, তানোরের ৩ হাজার ৬০০ পরিবারের ৩৬ মেট্রিক টন, পবার ৪ হাজার পরিবারে ৪০ মেট্রিক টন, মোহনপুরের ২ হাজার ৮০০ পরিবারে ২৮ মেট্রিক টন, বাগমারার ৭ হাজার ২০০ পরিবারে ৭২ মেট্রিক টন, দুর্গাপুরের ৩ হাজার ২০০ পরিবারে ৩২ মেট্রিক টন, বাঘার ৩ হাজার ৬০০ পরিবারে ৩৬ মেট্রিক টন, পুঠিয়া এবং চারঘাটের ২ হাজার ৮০০ করে পরিবারে ৫৬ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে এগুলো বিতরণ করা হচ্ছে। আরো সহায়তা পাওয়া গেলে তা দ্রুত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।