বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখক, ঔপন্যাসিক জর্জ অরওয়েল চাকুরি করিতেন ভারতে ব্রিটিশ পুলিশের (ইন্ডিয়ান ইমপেরিয়াল পুলিশ সার্ভিস) অ্যাসিস্ট্যান্স ডিসট্রিক্ট সুপারিনটেনডেন্ট পদে। অধিকাংশ সময় তাহার পোস্টিং ছিল ব্রিটিশশাসিত বার্মা প্রদেশ তথা বর্তমান মিয়ানমারে; কিন্তু তিনি মাত্র পাঁচ বত্সর চাকুরি করিয়া ‘ডার্টি ওয়ার্ক’ বলিয়া ১৯২৭ সালে এই চাকুরি ছাড়িয়া ফিরিয়া গিয়াছিলেন ইংল্যান্ডে। কেন ঐ চাকুরি তাহার নিকট ডার্টি ওয়ার্ক মনে হইয়াছে তাহা অনুমেয়। কোম্পানির নিকট হইতে ভারতের শাসনভার ব্রিটিশরাজের হাতে যাইবার পর ১৮৬১ সালে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অ্যাক্টস প্রবর্তনের মধ্য দিয়া ব্রিটিশ পুলিশ সৃষ্টি হইয়াছিল। বিভিন্ন ধরনের পোশাক, সজ্জা ও প্রস্তুতি থাকিলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হাফপ্যান্ট পরিহিত পুলিশের মাথায় থাকিত হ্যাট, হাতে ব্যাটন, লাঠি অথবা গাদা বন্দুক। ঐ ব্যাটন দিয়াই চলিত ভারতশাসন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোষণের পর উপমহাদেশ রানির হাতে গিয়া পড়িলেও শাসনের চেহারা ছিল একই রকম।
উপমহাদেশ ছাড়িয়া গেল ব্রিটেন। শিখাইয়া গেল আমাদেরকে লাঠি দিয়া শাসন করা। সেই ব্রিটেনের পুলিশের হাতে কোনো লাঠি নাই, বন্দুক নাই। কাহারো কাহারো কোমরে ছোট্ট একটি প্রতীকী ব্যাটন থাকিলেও তাহার ব্যবহার নাই; কিন্তু আমাদের এই দেশগুলিতে পুলিশের হাত হইতে লাঠি উঠিয়া যায় নাই। আমরা ছাড়িতে পারিলাম না। ইহার কারণ দুই দিক দিয়াই বিবেচ্য। একদিকে শাসকগোষ্ঠী লাঠির শাসনের মানসিকতা ত্যাগ করিতে পারে নাই, অন্যদিকে জনগণও লাঠি ছাড়া শাসনের সহিত নিজেদের পরিচিত করাইতে পারে নাই। বর্তমান বিশ্বে করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মানুষকে ঘরে অবরুদ্ধ থাকিবার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হইয়াছে প্রায় সারা বিশ্বের মানুষকে; কিন্তু লক্ষণীয়, উপমহাদেশের মানুষকে ঘরে আবদ্ধ করিয়া রাখিতে কোথাও কোথাও লাঠির ব্যবহার করিতে হইতেছে। আমেরিকা অথবা ব্রিটেনে কিন্তু কাহাকেও লাঠিপেটা করিয়া ঘরে রাখিতে হইতেছে না। ইহা হইতে স্পষ্ট হইয়া উঠে, ঔপনিবেশিক শক্তি আমাদের লাঠির শাসন শিখাইয়াছে বটে; কিন্তু লাঠি ব্যবহার করিতে হয় না—সেই শিক্ষা জনগণের মধ্যে বিস্তারের চেষ্টা করে নাই। দেশ প্রথমে ব্রিটেনের নিকট হইতে, পরে পাকিস্তানের নিকট হইতে স্বাধীন হইলেও ঐ শিক্ষা জনগণকে আমরাও দিতে পারি নাই যেন পুলিশের হাতে লাঠি থাকিতে না হয়। অথচ কথায় কথায় সমালোচনার জন্য উন্নত বিশ্ব তৈরি আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলি সমালোচনায় মুখর হইয়া উঠিয়া থাকে।
নোবেল বিজয়ী লেখক ভি এস নাইপল তাহার উপন্যাস ‘এরিয়া অব ডার্কনেস’-এ ভারত উপমহাদেশের অন্ধকারাচ্ছন্নতা দেখাইয়াছেন। তাহার ঐ গ্রন্থের সমালোচনা হইলেও এবং প্রকাশের পরপরই ভারতে নিষিদ্ধ হইলেও (পরে মুক্ত) যে বাস্তবতা তিনি তুলিয়া ধরিয়াছিলেন তাহা তো আজও আমাদের অস্বীকার করিবার উপায় নাই। আজও উপমহাদেশ ঔপনিবেশিক শাসনামলের স্বভাবচরিত্র ছাড়িতে পারে নাই, অথচ দেশ স্বাধীন হইয়াছে। ইহাই সম্ভবত আমাদের বড়ো দুর্বলতা।