করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ও সচেতনতা

১৭২০ সাল থেকে প্রতি ১০০ বছর পূর্তিতে একটি করে নতুন মহামারির সৃষ্টি হচ্ছে। ঐ বছর প্রথম বুবোনিক প্লেগ বৃহত্ আকারের মহামারি ছিল। ধারণা করা হয় যে, ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত মাছি দ্বারা এই রোগে তখন প্রায় ১ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এরপর ১৮২০ সালে থাইল্যান্ডে প্রথম কলেরা চিহ্নিত করা হলেও ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনসহ এশিয়ায় সব মিলে ১ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর রেকর্ড করা হয়। অতঃপর ১৯২০ সালে স্প্যানিশ ফ্লুর মাধ্যমে বিশ্বের ৫০ কোটি মানুষ আক্রান্ত হয় এবং এর মধ্যে প্রায় ১০ কোটি মানুষের মৃত্যু হয় যা ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক মহামারি। এরপর ঠিক ১০০ বছর পর দেখা দিল প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুতাণ্ডব।

এই ভাইরাস সম্পর্কে ১৯৮১ সালে Dean Koontz তার প্রকাশিত ‘The Eyes of Darkness’ বইয়ে তিনি লিখেছিলেন, করোনা ভাইরাস চীনের উহান এলাকার একটি ল্যাবরেটরিতে সংরক্ষণ করা আছে যা পরবর্তী সময়ে এই ভাইরাসকে ‘বায়োলজিক্যাল মারণাস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করা হবে। গ্রন্থে আরো বলা হয় যে, এই ভাইরাস মানুষের মাধ্যমেই ছড়ানো হবে, যদিও এই ভাইরাস যে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া হবে, এ সম্পর্কে অবশ্য তেমন কিছু ঐ গ্রন্থ থেকে অনুমান করা যায়নি। গত ১৬ মার্চ ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে Francis Boyle নামে এক মার্কিন গবেষকও ঠিক একই তথ্য উদ্ঘাটন করেন। তিনি দাবি করেন, এটি একটি ‘Biological Weapon’ যা চীনের উহান শহরের BLS-4 নামক একটি ল্যাব থেকে লিক করা হয়েছে। আজকের গ্লোকালাইজেশনের যুগে, বিশ্বব্যাপী এ রোগ ছড়িয়ে পড়া তেমন কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয়। কেননা, আজকের বিশ্ব শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানিতেই সীমাবদ্ধ নয়, মানব সম্পদের আদানপ্রদানও হচ্ছে হরহামেশা। যেহেতু, করোনা ভাইরাসের বাহক মানুষ, তাই এই রোগ যে কোনো দেশেই বিস্তৃত হতে পারে। আন্তর্জাতিক মহলে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমগুলোতে সচেতনতামূলক কথাবার্তা যতই না প্রচার করা হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে। বাংলাদেশ কিন্তু তার কিছুটা ব্যতিক্রম। প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে জন ও গণসচেতনতামূলক বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করা হচ্ছে টিভি ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াগুলোতে। করোনায় মৃত্যুঝুঁকির হার কম। তবে ভয়ের বিষয় হলো—এটি একটি ছোঁয়াচে রোগ। যদিও আমরা মনে করি, একটি মানুষের মৃত্যুও অনেক বড়ো একটি বিষয় কিন্তু হিসাব করলে দেখা যাবে, প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় যে পরিমাণ মানুষের মৃত্যু হয় তা কিন্তু কোনো অংশেই এই করোনায় মৃত্যুর হারের চেয়ে কম নয়। দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় দৈনিক গড়ে মারা যাচ্ছেন ২০ জন।

তাহলে প্রশ্ন হলো—কেন আমরা এই বিষয়টি নিয়ে এত উদ্বিগ্ন? কারণ, হলো, আমরা সচেতনতার চেয়ে কুসংস্কার কিংবা গুজবে অনেক বেশি বিশ্বাসী এবং আমরা জনসমাগমে আগ্রহী। অনেকে স্বপ্নে দেখা ওষুধ খেয়ে, অনেকে আবার তিনটি থানকুনি পাতা খেয়ে, কেউবা আবার আমপাতা থেকে নিঃসৃত মধু খেয়েও রোগ সারানোর চেষ্টা করেছেন। আবার কেউ কেউ গাছপালা বিক্রয়কারীর কাছ থেকেও করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক কেনার গুজব ছড়াচ্ছেন। এসব গুজব ছড়িয়ে অনেকে আবার রাতারাতি কোটিপতি না হলেও লাখোপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। ভয়ের বিষয় হলো—অনেকেই আবার প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার বাসায় মজুতের পাশাপাশি প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ক্রয়েও ঝাঁপিয়ে পড়েছেন বিভিন্ন ওষুধের দোকানে। ইতিমধ্যে অনেক জায়গাতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম বাড়তে শুরু করেছে। প্রশাসনও ইতিমধ্যে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা করেছেন। তবে প্রশাসনকে এ ব্যাপারে আরো বেশি নজরদারি করতে হবে যাতে এই করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের নামে ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্যমূল্য আর বৃদ্ধি করতে না পারে একই সঙ্গে জনগণ যাতে খাদ্যাভাব গুজবের নামে ব্যবসায়ীদের ন্যায় বাসায় বেশি বেশি পণ্য মজুতের চেষ্টা না করে। তাতে করে করোনার চেয়ে খাদ্যাভাবেই মানুষের হয়তো বেশি মৃত্যু হবে। প্রতিবছর রোজা আসতে না আসতেই পণ্যমূল্য বৃদ্ধির একটি সুযোগ খুঁজেন ব্যবসায়ীরা, যদিও এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন; কিন্তু সাধারণ মানুষের এই একটি ভুলের কারণে হয়তো ব্যবসায়ীরা তাদের সেই কাঙ্ক্ষিত সুযোগের সদ্ব্যবহার করলে করতেও পারেন। তাই প্রশাসনকে শুধু সতর্কীকরণ কিংবা সাবধানতা ঘোষণা নয়, প্রয়োজনবোধে কঠোর থেকে কঠোরতম ভূমিকাও গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনবোধে জেল-জরিমানা কিংবা লাইসেন্স বাতিলের উদাহরণও সৃষ্টি করা যেতে পারে।

এবার আসি তাহলে আমরা কি করোনায় সতর্ক হব না? অবশ্যই হব। ইতিমধ্যেই চীন থেকে করোনা ভাইরাসের চিকিত্সাসামগ্রী আমদানি করা হয়েছে। আমরা আশা করছি, দ্রুত চিকিত্সাব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কেননা শুধু কোয়ারেন্টাইনে বা আলাদা থাকাই শেষ সমাধান নয়। এছাড়াও শুধু মিডিয়ার প্রচারের ওপর নির্ভর না করে আমাদেরকেও আত্মসচেতন হতে হবে। আমাদের প্রত্যেকের উচিত—ব্যক্তি থেকে পরিবারের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এভাবে যে, ‘আমি সুস্থ নই, মানে আপনিও সুস্থ নন’। ইতিমধ্যে সৌদি ও ভারত সরকার ২১ দিনের কারফিউ জারি করেছে। নিউজিল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশেও জরুরি অবস্থা জারি হয়েছে। বাংলাদেশেও গত ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। Lock down করা হয়েছে গণ ও জনপরিবহন। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও যৌথ অভিযানের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে জেলায় জেলায় ঘরে থাকা নিশ্চিতকরণ অভিযান; কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমি-আপনি সচেতন না হলে এ অভিযান থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় নেই। তাই আমার-আপনার এমনকি দেশের স্বার্থে ভ্রমণ, গণজমায়েত পরিহারের পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা। কেননা জনসমাগমপূর্ণ এলাকা থেকেই এই রোগের বিস্তার পরিলক্ষিত হয়েছে, যেমনটি ঘটেছে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি গীর্জা থেকে ৩ হাজারেরও বেশি। মালয়েশিয়ার একটি তবলিগ জমায়েত থেকেও এরোগের বিস্তার ঘটার তথ্য পাওয়া যায়। ইতালির ক্ষেত্রে এর ভিন্নতা নয়। তাই এমুহূর্তে শুধু সরকারি নির্দেশনাই নয়, ব্যক্তি পর্যায়ে আমাদেরকে সচেতন হতে হবে। তাই যারা বিদেশ থেকে বাংলাদেশে এসেছেন, তারা যদি অবগত থাকেন যে, তাদের দ্বারা করোনা ছড়ানোর সম্ভাবনা আছে, তাহলে তাদের উচিত, তার এমনকি তার পরিবারের স্বার্থে হলেও নিজে যেন নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখেন। একই সঙ্গে মানতে হবে স্বাস্থ্যবিধির বিভিন্ন নিয়মকানুনও। অন্যথায় এটি প্রাদুর্ভাবেই পরিণত হবে। মৃত্যু হবে লক্ষ থেকে লক্ষান্তরে, ছাড়িয়ে যেতে পারে সর্বশেষ স্প্যানিশ ফ্লুর রেকর্ডও। তাই আসুন, আমরা কণ্ঠে কণ্ঠ মিলাই, ‘করোনাকে করো না ভয়, সচেতনতাই মুক্তি দেয়’। একই সঙ্গে আমরা যেন, কোনো গুজবে কান না দেই, এদিকেও খেয়াল রাখা অত্যন্ত জরুরি। আমরা যেন, নিজেরা সুস্থ থাকি এবং অন্যকে সুস্থ রাখি ।

n লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ,

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়