আইসিইউ শয্যা বাড়ানোর তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বাংলাদেশে নতুন কারো মধ্যে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েনি। তবে এ ভাইরাসটি যে কোনো সময় ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেছেন, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে অনেককে সাপোর্ট দিতে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) সেবা জরুরি। তাই সময় থাকতে এখনই সারাদেশের সব সরকারি মেডিক্যাল কলেজে আইসিইউ শয্যা বাড়াতে হবে। অন্যথায় করোনা দেশে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না।  প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ জানান, দুই দিন ধরে নতুন রোগী পাওয়া হয়নি। এটা আমাদের জন্য স্বস্তিদায়ক হলেও যে কোনো সময় এটা ব্যাপকতা ধারণ করতে পারে। আর তখন অনেককে আইসিইউ সাপোর্ট দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তাই এখনই আইসিইউ শয্যা প্রস্তুত করতে হবে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, যে প্রস্তুতি আছে, ব্যাপক হারে দেখা দিলে তা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। কারণ আইসিইউ সবাই চালাতে পারে না। তাই সময় থাকতে যারা অবসরে গেছেন তাদের আপত্কালীন কাজে লাগানো যেতে পারে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া বলেন, ব্যাপক হারে বাড়লে এই যে প্রস্তুতি তা দিয়ে কোনোভাবেই সামাল দেওয়া সম্ভব না। অবসরপ্রাপ্তদের নিয়ে এখনই আইসিইউ প্রস্তুত রাখা উচিত।

আছে মাত্র ২৯টি আইসিইউ শয্যা

জানা গেছে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ১৮ শতাংশ রোগীর আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সাপোর্ট লাগতে পারে। এর মধ্যে ৫ শতাংশ রোগীর আইসিইউ আর ১৩ শতাংশ রোগীর ভেন্টিলেটর সাপোর্ট প্রয়োজন হবে। কিন্তু দেশে করোনা ভাইরাসের রোগীদের চিকিত্সার জন্য নির্দিষ্ট করা পাঁচটি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা আছে মাত্র ২৯টি। এর সবগুলোই ঢাকায়। রাজধানীর বাইরে আইসোলেশনের ব্যবস্থা রাখা হলেও এর কোথাও এখন পর্যন্ত আইসিইউ সুবিধা প্রস্তুত হয়নি।                 অন্যদিকে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা থাকলেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকায় চাইলেই সেগুলো ব্যবহার করা যাবে না।

জানা গেছে, করোনা রোগীদের চিকিত্সায় সরকার শুধু ঢাকায় পাঁচটি হাসপাতাল নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে আইসিইউ শয্যা রয়েছে উত্তরার বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ১০টি, শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে আটটি, উত্তরা রিজেন্ট হাসপাতালে তিনটি, মিরপুর রিজেন্ট হাসপাতালে তিনটি এবং যাত্রাবাড়ীর সাজিদা ফাউন্ডেশন হাসপাতালে পাঁচটি। আর ঢাকার বাইরের মেডিক্যাল কলেজে সীমিত পরিসরে আইসিইউ শয্যা থাকলেও অনেক জায়গায় ভেন্টিলেটর নেই, অক্সিজেন নেই। কোনো কোনো মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এসব থাকলেও আইসিইউয়ের যন্ত্রপাতিও বিকল। তাই আইসিইউ শয্যা দ্রুত বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রসঙ্গত, সরকারি সব মেডিক্যাল কলেজে মাত্র ২ শতাধিক আইসিইউ শয্যা রয়েছে।

১১ স্থানে টেস্টের ব্যবস্থা : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

গতকাল নিজ বাসা থেকে অনলাইনে সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, দেশে ৫০০-এর মতো ভেন্টিলেটর আছে। আরো সাড়ে ৩০০ আসছে। তাই বিভ্রান্ত করার মতো কোনো সংবাদ পরিবেশন করা উচিত না। এখন আমাদের উচিত হলো সকলে মিলে একযোগে কাজ করা। তিনি বলেন, ‘আমরা টেস্টিং ফ্যাসিলিটি রাতারাতি বৃদ্ধি করছি। আমরা আগে একটি জায়গা থেকে টেস্ট করতাম। এখন ১১টি জায়গা থেকে টেস্ট করতে সক্ষম হচ্ছি। অলরেডি ছয়-সাতটি জায়গা থেকে শুরু হয়ে গেছে। আর বাকিগুলোও শুরু হয়ে যাবে।’

মন্ত্রী আরো বলেন, করোনা ভাইরাস শনাক্তে পিসিআর টেস্টের জন্য দেশে এখন ৪৫ হাজার কিট আছে। আরো প্রায় ৮৫ হাজার কেনার আদেশ দেওয়া হয়েছে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে বাংলাদেশের প্রস্তুতি ছিল না—এমন অভিযোগ নাকচ করে তিনি বলেন, ‘কিটের বিষয়েও অনেকরকম কথাবার্তা শুনেছি। এগুলো পর্যাপ্ত আছে। পিপিই আছে কিনা কথা উঠেছে। এরই মধ্যে প্রায় ৩ লাখ পিপিই বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এপ্রিলের মধ্যে প্রায় ৫ লাখ পিপিই পাওয়া যাবে।’ করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রশংসা করেছে বলে দাবি করেন তিনি। 

১০৯ জনের নমুনা পরীক্ষা, নতুন আক্রান্ত নেই

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা গতকাল রবিবার ভার্চুয়াল ব্রিফিংয়ে বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ১০৯ জনের নমুনা পরীক্ষা করে কারো মধ্যে নতুন করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েনি। তার মানে সর্বমোট আক্রান্তের সংখ্যা আগের মতোই ৪৮ জন আছে। এর মধ্যে ১৫ জন সংক্রমণমুক্ত, সুস্থ হয়ে বাড়ি চলে গেছেন। নতুন করে কারো মৃত্যু তথ্য না আসায় মৃতের মোট সংখ্যা আগের মতোই পাঁচ জন।

এদিকে গতকাল মানিকগঞ্জে করোনা ভাইরাসের লক্ষণ নিয়ে সুচিত্রা সরকার (২৬) নামে এক গৃহবধূ মারা গেছেন। এছাড়া বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিত্সাধীন অবস্থায় আরো দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। সুচিকিত্সার অভাবেই তারা মারা গেছেন বলে দাবি করেছেন তাদের স্বজনরা।

স্বামীর মৃত্যু, স্ত্রী কোয়ারেন্টাইনে

করোনা ভাইরাসে মৃত সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তার স্ত্রী কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন। গতকাল ৭২ বয়সী এই বৃদ্ধা বলেন, শারীরিক নানা জটিলতায় তিনি একরকম শয্যাশায়ী। ফ্রিজে মাছ-মাংস আছে যথেষ্ট, চাল-ডালেরও অভাব নেই। কিন্তু রাঁধবার মানুষ নেই। এক ভাগনে টুকটাক যা রাঁধেন তা-ই খান, কখনো কখনো প্রতিবেশী কিংবা বোন খাবার পাঠান।

হোম কোয়ারেন্টাইনে এমপি

হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সংসদ সদস্য দবিরুল ইসলাম। কিছুদিন আগে তিনি চিকিত্সার জন্য ব্যাংকক গিয়েছিলেন। কিন্তু করোনার কারণে অপারেশন না করেই দেশে ফিরে আসেন। এরপর নিয়ম মেনে তিনি কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন।

চিকিত্সকদের জন্য পরিবহন ব্যবস্থা

করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় বন্ধ গণপরিবহন। এ অবস্থায় কর্মক্ষেত্রে যেতে নানা ভোগান্তিতে পড়ছেন চিকিত্সক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। তবে এ পরিস্থিতিতে তাদের হাসপাতালে আসা-যাওয়া নিশ্চিত করতে পরিবহন সেবা চালু করেছে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ), ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি হাসপাতাল। গতকাল পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে হাসপাতালগুলো।

তিন দিনেও রোগীর পরীক্ষা হয়নি

গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে এক যুবক তিন দিন  ধরে ভর্তি থাকলেও তার স্যাম্পল না নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার কোভিড-১৯ রোগের লক্ষণ নিয়ে আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি হয়েছেন হতদরিদ্র মেহেদী হাসান নামের ঐ যুবক। হাসপাতালের আবাসিক চিকিত্সক মো. রফিকুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া জানান, করোনা ভাইরাস আক্রান্ত সন্দেহে বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে দুই জনকে ভর্তি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম অফিস জানায়, বিআইটিআইডিতে এই পর্যন্ত ২২ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি।